শিরোনামঃ
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আটক: নেওয়া হয়েছে ডিবি কার্যালয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ: ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ শ্লোগানে নতুন অঙ্গীকার আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবিটি গুজব ধেয়ে আসছে শক্তিশালী বৃষ্টিবলয় ‘গর্জন’: দেশজুড়ে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস সংরক্ষিত নারী আসনে এনসিপি: আলোচনায় মিতু ও নুসরাত তাবাসসুমসহ একঝাঁক মুখ সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের ১৩ প্রার্থী চূড়ান্ত: শিগগিরই আসছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ‘আমরা ইরানকে ধ্বংস করে দিচ্ছি, কিছুই বাকি থাকবে না’: ট্রাম্প ট্রাম্পের নিশানায় ইরানের কোন কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র? ‘রাজনৈতিক সবুজ সংকেত পেলেই চলবে যুদ্ধ’: ইরানের সেনাবাহিনীর কঠোর বার্তা ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ: একনজরে পূর্ণাঙ্গ সময়সূচী ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচসমূহ
মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৫ অপরাহ্ন

দেশীয় উৎপাদন সত্ত্বেও কেন জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ২২ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

তীব্র গরম আর রোজা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজার এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার আসাদগেট থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের জন্য মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি। অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে পেট্রোলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের একটি বড় অংশ দেশীয় উৎস থেকে মেটানো সম্ভব। তবে কেন এই হাহাকার? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক, কৃত্রিম চাহিদা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অব্যবস্থাপনার এক জটিল চিত্র।


১. উৎপাদনের পরিসংখ্যান: স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাধা কোথায়?

বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের বড় একটি অংশ আসে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট (তরল হাইড্রোকার্বন) প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে।

  • পেট্রোল: দেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন। এর প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ আসে দেশীয় কনডেনসেট থেকে। বাকিটা ইস্টার্ন রিফাইনারি (ERL) অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদন করে। ফলে পেট্রোল আমদানির তেমন প্রয়োজন হয় না।

  • অকটেন: অকটেনের বার্ষিক চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। এর প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকিটা আমদানি করতে হয়।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)-এর দুটি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি বন্ধ হলেও বাংলাদেশ অন্তত পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে এখনই শূন্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে নেই।

২. সংকটের মূলে ‘প্যানিক পারচেজ’ বা আতঙ্কিত ক্রয়

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের মতে, বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ অস্বাভাবিক চাহিদা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধাবস্থা এবং বৈশ্বিক তেলের বাজার নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ফুরিয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক তৈরি করেছে।

  • চাহিদার উল্লম্ফন: যেখানে একটি পাম্পে দিনে গড়ে ৫-৬ হাজার লিটার তেলের চাহিদা থাকে, সেখানে বর্তমানে ডিমান্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-৩০ হাজার লিটারে।

  • ট্যাংক ফুল করার প্রবণতা: বাইকার বা গাড়িচালকরা আগে ২-৫ লিটার তেল নিলেও এখন সবাই ট্যাংক পূর্ণ করে রাখছেন। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে পাম্পগুলোর দৈনিক বরাদ্দ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

৩. কৃত্রিম সংকট ও অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য

রাষ্ট্রীয় তিন তেল কোম্পানি (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা) রেশনিং শুরুর ঠিক আগে মাত্র ৭ দিনে পৌনে ২ লাখ টন তেল ডিলারদের হাতে তুলে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই তেলের বড় একটি অংশ সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে অসাধু ডিলার ও মজুতদারদের হাত ধরে কালোবাজারে চলে গেছে। গত এক সপ্তাহে দেশের ২২টি জেলায় তেলের অবৈধ মজুত ধরা পড়েছে, যা প্রমাণ করে সংকটটি যতটা না ঘাটতির, তার চেয়ে বেশি কৃত্রিম।

৪. নিজস্ব উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম তামিম-এর মতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

  • গ্যাস উৎপাদন হ্রাস: বিবিয়ানা ও রশিদপুরের মতো বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কনডেনসেট প্রাপ্তিও কমেছে।

  • আমদানি নির্ভরতা: অকটেনের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। যুদ্ধাবস্থায় লজিস্টিক সমস্যার কারণে আমদানিতে সামান্য দেরি হলেই বাজারে তার বড় প্রভাব পড়ছে।

৫. পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পদক্ষেপ

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, সরকার মে মাস পর্যন্ত তেলের মজুত নিশ্চিত করতে উচ্চমূল্যে সিঙ্গাপুর থেকে তেল আমদানি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার নিচের পদক্ষেপগুলো নিয়েছে:

  • রেশনিং ও কিউআর কোড: ঢাকায় মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোড এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে গাড়ির জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

  • ট্যাগ অফিসার: প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে তদারকির জন্য সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

  • ভর্তুকি: তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকার দৈনিক ১৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।


জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ফল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণ যদি সাশ্রয়ী হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনা বন্ধ করে, তবে বর্তমান মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা দিয়েই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোর বিতরণ প্রক্রিয়ায় যে স্বচ্ছতার অভাব দেখা গেছে, তার কঠোর বিচার না হলে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা দূর করা কঠিন হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...