২০২৬ সালের এপ্রিল মাস বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশ এখন জাতীয় সংসদে আইনি বৈধতা পাওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু সংসদের ভেতরে ও বাইরে এই অধ্যাদেশগুলোর ‘ল্যাপস’ বা বিলুপ্ত হওয়া এবং বিশেষ করে রাজস্ব খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার থেকে বর্তমান সরকারের সরে আসার ইঙ্গিত এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে ‘জুলাই স্পিরিট’ রক্ষার অঙ্গীকার, অন্যদিকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে সংস্কার কর্মসূচিগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সংসদে দ্বিতীয় দফার আলোচনা শেষেও ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। সরকার সনদের দফাগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে অনড় অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে, বিরোধী দল সংবিধান সংস্কারকে এই রাজনৈতিক দলিলের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখছে। সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের ৬২ বিধিতে আনা মুলতবি প্রস্তাবটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সনদটি কেবল একটি কাগুজে দলিল নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ব্লু-প্রিন্ট। সংবিধান সংশোধনের এই রশি টানাটানি আগামী দিনগুলোতে সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে যে আলোচনার দাবি তুলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ কমিটির রিপোর্টে কিছু অধ্যাদেশ ‘ল্যাপস’ করার প্রস্তাব আসায় তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বা ‘জুলাই স্পিরিট’ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে শুরুতে কিছুটা অস্পষ্টতা থাকলেও পরে তিনি স্বীকার করেছেন যে, আলোচিত বিলগুলো ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশেরই অংশ। ৯ই এপ্রিলের মধ্যে ৯৩টি বিল পাসের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ স্পিকার হাতে নিয়েছেন, তাতে প্রতিটি অধ্যাদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী, প্রতিটি অধ্যাদেশ যদি জনগণের অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তবে সেগুলোর বিলুপ্তি বা পাশ কাটানো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে সরকারের অনাগ্রহ। অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআর-কে ভেঙে কর নীতি প্রণয়ন এবং কর আদায়ের জন্য দুটি পৃথক বিভাগ তৈরি করেছিল—যা ছিল গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার প্রস্তাব।
কেন এই সংস্কার জরুরি ছিল? এনবিআর একইসাথে কর নির্ধারণ এবং কর আদায় করার কারণে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হতো। সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ যেমনটা বলেছেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে এই বিভাজন ছিল ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি।
কেন সরকার পিছিয়ে যাচ্ছে? ধারণা করা হচ্ছে, এনবিআর কর্মকর্তাদের আন্দোলন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভয়ে সরকার এই সংস্কারটি এখনই বিল আকারে তুলছে না। ১০ই এপ্রিলের মধ্যে এটি সংসদে না তুললে অধ্যাদেশটি তার কার্যকারিতা হারাবে।
রাজস্ব খাতের এই সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসা কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবেও নেতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। আইএমএফ-এর ৫৫০ কোটি ডলার ঋণের পরবর্তী কিস্তি এবং নতুন করে আরও ২০০ কোটি ডলার পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সংস্কার ছিল অন্যতম শর্ত। আগামী ১৩-১৮ই এপ্রিল ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল যখন যোগ দেবেন, তখন এই সংস্কার থেকে সরে আসার বিষয়টি তাঁদের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে এই ঋণের কিস্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য এখন অত্যাবশ্যক।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ৪টি অধ্যাদেশ বাতিল এবং ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই সংসদে না তোলার সুপারিশ থেকে বোঝা যায় যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ এবং দুদকের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে বর্তমান সরকার এখনই হাত দিতে চাইছে না। বিশেষ করে এনবিআর কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে সরকারের অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে, বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারগুলো রাজনৈতিক সরকারের আমলে আমলাতান্ত্রিক চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় বিতর্ক কেবল বিল পাস বা বাতিলের বিষয় নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোর লড়াই। একদিকে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অধ্যাদেশগুলোর হেফাজত করা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাজস্ব খাতের মতো ‘অরাজনৈতিক’ সংস্কারগুলোকে রক্ষা করা। সরকার যদি আইএমএফ-এর শর্ত এবং ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে সংস্কার থেকে পিছু হটে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী, সংসদের প্রতিটি অধ্যাদেশ নিয়ে স্বচ্ছ আলোচনা এবং জুলাই স্পিরিটের আলোকে আইন প্রণয়নই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।