হরমুজ প্রণালি — পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি তেল পৌঁছানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ প্রণালির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সামরিক হামলা শুরু করলে পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়। আর সেই একটি সিদ্ধান্তেই ঘুরে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর। দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৬৫ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। এর মধ্যে তেলের আমদানি নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি — প্রায় ৯৫ শতাংশ। এর উপরে নেই বললেই চলে কোনো কৌশলগত মজুদ ব্যবস্থা। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে যেকোনো ধাক্কা সরাসরি এসে লাগে দেশের অর্থনীতিতে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য যার সঙ্গে দেশের সবকিছুর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমান জ্বালানি সংকট অর্থনীতিকে অত্যন্ত নেতিবাচক দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার মতে, ইরান যুদ্ধ নতুন কোনো দুর্বলতা তৈরি করেনি — বরং আগে থেকেই বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন আর কোনো একটি খাতে সীমাবদ্ধ নেই। অন্তত দশটি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। তেল ও গ্যাসের অভাবে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে লোডশেডিং বেড়েছে, যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে শিল্প থেকে শুরু করে গৃহস্থালি পর্যন্ত সব পর্যায়ে।
পরিবহণ খাতে সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বাস, ট্রাক, লঞ্চ — প্রায় সব যানবাহন ডিজেলে চলে। তেলের সংকটে পণ্য পরিবহণের ভাড়া বেড়েছে। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে, যা বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত গার্মেন্ট শিল্পসহ টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল — সব কারখানায় জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমলে রপ্তানি কমবে, শ্রমিকদের আয় কমবে, এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা লাগবে।
কৃষিতে সেচপাম্প ও ট্রাক্টর চালু রাখতে ডিজেল ও বিদ্যুৎ দুটোই জরুরি। সরবরাহ কমে আসায় আগামী মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
হাসপাতাল, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইটি প্রতিষ্ঠান — সেবা খাতের কোনো কিছুই বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতে মোবাইল টাওয়ার ও ডাটা সেন্টারে লোডশেডিংয়ের প্রভাব ইতোমধ্যেই অনুভূত হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার চারটি পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কেট খোলা রাখার সময় কমিয়ে আনা, লোডশেডিং বৃদ্ধি, অফিসের সময় এগিয়ে আনা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সব পদক্ষেপের সারকথা হলো চাহিদা কমানো। সরবরাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয়নি।
সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়কমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অবশ্য দাবি করেছেন যে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে। কিন্তু বাস্তবে পেট্রোলপাম্পগুলোতে তেলের জন্য মালিক ও ক্রেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত হচ্ছে।
সংকটের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা। বর্তমানে বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৫ বিলিয়ন ডলারে। বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে প্রতিনিয়ত নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। এর উপর যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, তাহলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে এবং বিকল্প পথে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল চাহিদা কমানোর নীতিতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি টিকবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শিগগিরই না থামলে বাংলাদেশের সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। জিডিপির তিনটি মূল স্তম্ভ — কৃষি, শিল্প ও সেবা — সবকটিই এখন চাপে। দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান, কৌশলগত তেল মজুদ গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া কোনো টেকসই পথ নেই।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ · মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব · ১০ খাতে বিপর্যয়
🔥