বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৫ অপরাহ্ন

শূন্য মুনাফা: দেউলিয়া হওয়ার পথে কি ১৭ ব্যাংক?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন

মুনাফাহীন ১৭ ব্যাংক, সিএসআর শূন্য ১১ : সঙ্কটে ব্যাংক খাত

খেলাপি ঋণ · মূলধন ঘাটতি · দুর্বল ব্যবস্থাপনা · সুশাসনের সঙ্কট

🏦
১৭টিব্যাংক মুনাফা
করতে পারেনি (২০২৪)
১১টিব্যাংকে সিএসআর
ব্যয় শূন্য (২০২৫)
৬টিব্যাংক লোকসানেও
সিএসআর করেছে
৩৪৫কোটি টাকা মোট
সিএসআর ব্যয়
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের তালিকা
📉 মুনাফাহীন ১৭ ব্যাংক (২০২৪)
জনতা ব্যাংক ★
অগ্রণী ব্যাংক ★
বেসিক ব্যাংক ★
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ★
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ★
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ★
ন্যাশনাল ব্যাংক ★
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ★
পদ্মা ব্যাংক ★
ইউনিয়ন ব্যাংক ★
ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ★
এবি ব্যাংক
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
আইসিবি ইসলামী ব্যাংক
আইএফআইসি ব্যাংক
এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক
সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক
🚫 সিএসআর ব্যয় শূন্য ১১ ব্যাংক (২০২৫)
জনতা ব্যাংক ★
অগ্রণী ব্যাংক ★
বেসিক ব্যাংক ★
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ★
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ★
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ★
ন্যাশনাল ব্যাংক ★
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ★
পদ্মা ব্যাংক ★
ইউনিয়ন ব্যাংক ★
ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ★

★ উভয় তালিকায় থাকা ব্যাংক — একই সাথে মুনাফাহীন এবং সিএসআর ব্যয় শূন্য

২০২৫ সালে মোট সিএসআর ব্যয়ের বিতরণ
📚
৯৮.৪৪ কোটি
শিক্ষা খাত
🏥
৮৫.৬৪ কোটি
স্বাস্থ্য খাত
🌿
৩৪.৫০ কোটি
পরিবেশ ও জলবায়ু
🤝
১২৬.৪৭ কোটি
অন্যান্য খাত
মোট সিএসআর ব্যয় (২০২৫) ৩৪৫.০৫ কোটি টাকা
সঙ্কটের মূল কারণসমূহ
⛓️
খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি
বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও বড় ঋণগ্রহীতারা নতুন সুবিধা পাচ্ছেন
🏛️
দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন
পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ক্ষতিগ্রস্ত
💻
প্রযুক্তিগত দুর্বলতা
পুরনো সফটওয়্যার ও ম্যানুয়াল সিস্টেম ব্যবহারে ঝুঁকি বাড়ছে
📉
মূলধন ঘাটতি
মুনাফা না থাকায় অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা হার কমছে
বিশেষজ্ঞ প্রস্তাবিত সংস্কার পদক্ষেপ
বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে
পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে
ব্যাংকিং সফটওয়্যার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে
মুনাফাভিত্তিক সিএসআর ব্যয় বাধ্যতামূলক পর্যবেক্ষণে আনতে হবে
⚠️ বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: দ্রুত সংস্কার না হলে ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদন ২০২৪-২৫এপ্রিল ২০২৬

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বলা হয় ব্যাংকিং খাতকে। কিন্তু সেই হৃদপিণ্ড এখন তীব্র ‘রক্তশূন্যতা’ বা তারল্য সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এক পিলে চমকানো তথ্য: ২০২৪ সালে দেশের ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংক তাদের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর (CSR) খাতে এক পয়সাও ব্যয় করতে পারেনি। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের যে বিষবৃক্ষ গত কয়েক দশকে রোপণ করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তার ফল ভোগ করছে সাধারণ আমানতকারী ও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।

মুনাফাহীনতার বৃত্তে ১৭ ব্যাংক: কেন এই পতন?

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শরীয়াহ ভিত্তিক ও নতুন প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক। জনতা, অগ্রণী, বেসিক, এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত দানবগুলো এখন মুনাফার বদলে লোকসানের ভারে নুয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি এবি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও নিট মুনাফা দেখাতে পারেনি।

মুনাফাহীনতার প্রধান কারণসমূহ:

  • উচ্চ খেলাপি ঋণ: বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই বছরের পর বছর টাকা ফেরত দিচ্ছেন না, অথচ ক্ষমতার প্রভাবে নতুন নতুন সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন।

  • অনাদায়ী সুদ আয়: ঋণের টাকা আদায় না হওয়ায় কাগজে-কলমে আয় দেখালেও বাস্তবে ব্যাংকের হাতে নগদ টাকা নেই।

  • দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করায় অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

  • পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি: কিছু ব্যাংকের প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিএসআর শূন্য ১১ ব্যাংক: সামাজিক দায়বদ্ধতার মৃত্যু?

ব্যাংকগুলো তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় ব্যয় করে থাকে। কিন্তু ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংক—যার মধ্যে জনতা, অগ্রণী, বেসিক ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক রয়েছে—একটি টাকাও এই খাতে খরচ করেনি।

সিএসআর কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাওয়ার মানে হলো, হাজার হাজার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর বৃত্তি বন্ধ হয়ে যাওয়া, গ্রাম্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অনুদান বন্ধ হওয়া এবং পরিবেশ রক্ষা কার্যক্রম থমকে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই শূন্য ব্যয় কেবল আর্থিক দুর্বলতা নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি চরম অনীহারও বহিঃপ্রকাশ। ব্যাংকগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক সংকট কাটাতে এতটাই দিশেহারা যে, সাধারণ মানুষের কল্যাণে খরচ করার মতো মানসিকতা বা সক্ষমতা—কোনোটিই তাদের অবশিষ্ট নেই।

মুনাফা নেই কিন্তু সিএসআর আছে: এক রহস্যময় বৈপরীত্য

প্রতিবেদনের একটি অদ্ভুত দিক হলো, ২০২৪ সালে মুনাফা করতে না পেরেও ২০২৫ সালে ৬টি ব্যাংক সিএসআর ব্যয় করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত পূর্ববর্তী বছরের অবিক্রিত বা অবশিষ্ট সিএসআর ফান্ড (Reserve) থেকে করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, যেখানে ব্যাংকগুলো মূলধন সংকটে ভুগছে এবং নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে লোকসানি অবস্থায় সিএসআর ব্যয় চালিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত? এটি কি কেবল ইমেজ রক্ষার চেষ্টা না কি কোনো প্রশাসনিক শুভঙ্করের ফাঁকি, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।

খেলাপি ঋণের ‘ক্যানসার’ ও সুশাসনের অভাব

দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। বড় ঋণখেলাপিরা ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও আইনি মারপ্যাঁচে এবং রাজনৈতিক প্রভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চরম অভাব দেখা যাচ্ছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী যখন ব্যাংকের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে, তখন সেই ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকের আস্থার প্রতীক না হয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ‘টাকা তোলার মেশিনে’ পরিণত হয়।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও কিছু ব্যাংক এখনো পুরনো সফটওয়্যার ও ম্যানুয়াল সিস্টেমে কাজ করছে, যা ডিজিটাল জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।

 অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাব

ব্যাংকিং খাতের এই ভঙ্গুর অবস্থা সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকগুলো যখন মুনাফা করতে পারে না, তখন তাদের মূলধন পর্যাপ্ততা কমে যায়। এর ফলে:

  • বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়া: নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, ফলে শিল্পায়ন থমকে যাচ্ছে।

  • কর্মসংস্থান সংকট: বিনিয়োগ কমলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না, যা বেকারত্ব বাড়াচ্ছে।

  • জিডিপি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়া: ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (GDP Growth) শ্লথ করে দিচ্ছে।

  • বৈদেশিক ঋণে প্রভাব: দুর্বল ব্যাংকিং খাতের কারণে আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের মান কমিয়ে দিতে পারে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ঋণের পথ কঠিন করে তুলবে।

উত্তরণের পথ কী?

২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় শূন্য হওয়া এবং ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংকের মুনাফাহীনতা কেবল একটি সংখ্যা নয়—এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘অ্যালার্ম বেল’ বা সতর্ক সংকেত। এই সংকট থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি: ১. কঠোর আইনি ব্যবস্থা: বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ২. সুশাসন নিশ্চিত করা: ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ৩. প্রযুক্তি আধুনিকীকরণ: ব্যাংকিং সফটওয়্যার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বমানের করতে হবে। ৪. সক্রিয় তদারকি: বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল কাগজ-কলমে নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

যদি দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই ১৭টি ব্যাংকের আর্থিক রক্তক্ষরণ পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। সময় এখন কথা বলার নয়, কঠোর অ্যাকশন নেওয়ার।


এ জাতীয় আরো খবর...