মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

শিরোপা বিতর্কের পর এবার ডোপিং কেলেঙ্কারিতে সেনেগাল

ক্রীড়া প্রতিবেদক | রাবাত, মরক্কো / ৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (AFCON) ফাইনালকে ঘিরে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা ও বিতর্ক যেন কোনোভাবেই শেষ হচ্ছে না। মাঠের লড়াই গড়িয়েছে আদালতের বারান্দায়, আর এবার সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে সেনেগালের বিরুদ্ধে ওঠা ডোপিং টেস্ট এড়িয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ। মরক্কোর বিরুদ্ধে বিতর্কিত সেই ফাইনালের পর নতুন এই তথ্য আফ্রিকান ফুটবলে কেবল অস্থিরতাই বাড়ায়নি, বরং সেনেগালের ফুটবলের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ব ডোপবিরোধী সংস্থা ‘ওয়াডা’র (WADA) ভূমিকা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

মাঠের উত্তেজনা থেকে ট্রফি বাতিলের নজির

গত জানুয়ারিতে মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই শক্তিশালী দল—সেনেগাল ও মরক্কো। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় সেনেগাল। কিন্তু সেই জয় উদযাপনের সুযোগ তারা পায়নি। ম্যাচের একটি পেনাল্টি সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তির জেরে সেনেগালের খেলোয়াড়রা মাঠ ত্যাগ করলে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (CAF) কঠোর অবস্থান নেয়। ঘটনাটিকে ‘ম্যাচ বর্জন’ হিসেবে অভিহিত করে সেনেগালের শিরোপা বাতিল করা হয় এবং মরক্কোকে ৩-০ ব্যবধানে জয়ী ঘোষণা করে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। সেনেগাল বর্তমানে এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে (CAS) লড়ছে।

নতুন বিতর্ক: ডোপিং টেস্ট এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ

শিরোপা হারানোর ক্ষোভের মধ্যেই সেনেগালের ওপর আছড়ে পড়েছে নতুন বিপদ। মরক্কোর প্রথিতযশা সাংবাদিক ইউসেফ আল-তামসামানি এক চাঞ্চল্যকর ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, ফাইনাল ম্যাচ শেষে সেনেগালের কোনো খেলোয়াড়ই বাধ্যতামূলক ডোপিং পরীক্ষায় অংশ নেননি। তার দেওয়া তথ্যমতে, ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র ৩৫ মিনিটের মাথায় সেনেগাল দল রাবাতের প্রিন্স মৌলাই আব্দেল্লাহ স্টেডিয়াম ত্যাগ করে। আন্তর্জাতিক ফুটবল নীতি অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ ডোপিং পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য ৩৫ মিনিট সময় কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। এই দ্রুত প্রস্থানই মূলত সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করেছে।

ফিফা ও সিএএফ-এর কঠিন নিয়মাবলী

ফিফা এবং সিএএফ-এর ডোপবিরোধী আইন অত্যন্ত কড়া। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের পর লটারির মাধ্যমে প্রতিটি দল থেকে অন্তত দুজন খেলোয়াড়কে নমুনা প্রদানের জন্য নির্বাচন করা হয়। ম্যাচ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই নির্বাচিত খেলোয়াড়দের ডোপিং কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত হতে হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্তৃপক্ষের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকেন। সেনেগাল যদি সত্যিই এই পরীক্ষা এড়িয়ে গিয়ে থাকে, তবে তা কেবল ফুটবলীয় অপরাধ নয়, বরং বড় ধরনের নৈতিক স্খলন হিসেবে বিবেচিত হবে। আল-তামসামানির দাবি, তার ব্রাসেলসভিত্তিক একটি বিশ্বস্ত সূত্র ইতিমধ্যে ওয়াডা ও সিএএফ-এর সাথে যোগাযোগ করেছে, তবে এখনো সেখান থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কেন এই রহস্যময় নীরবতা?

সাংবাদিক আল-তামসামানি প্রশ্ন তুলেছেন, সেনেগাল দল কেন এত দ্রুত স্টেডিয়াম ছাড়ল? সাধারণত একটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সারতেই কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সেখানে মাত্র ৩৫ মিনিটে পুরো দলের প্রস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, হয়তো তারা সচেতনভাবেই কোনো কিছু লুকাতে চেয়েছিল। এছাড়া সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং খেলোয়াড়দের ওপর ডোপিংয়ের প্রভাব নিয়ে যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। যদি প্রমাণিত হয় যে খেলোয়াড়রা ডোপিং টেস্ট এড়াতে পালিয়েছেন, তবে সেনেগালের ওপর কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসতে পারে।

ফুটবল বিশ্বে সম্ভাব্য প্রভাব

সেনেগালের মতো একটি শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বিশ্ব ফুটবলেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাদিও মানেদের উত্তরসূরিরা যদি ডোপিংয়ের মতো কলঙ্কজনক অধ্যায়ে জড়িয়ে পড়েন, তবে তা পুরো মহাদেশের ফুটবলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে। সিএএফ-এর জন্য এটি এখন বড় পরীক্ষা—তারা কি কেবল মাঠ বর্জনের দায়ে শিরোপা কেড়েই শান্ত থাকবে, না কি ডোপিংয়ের মতো গভীর ষড়যন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলবে? অন্যদিকে মরক্কো ফুটবল ভক্তরা মনে করছেন, ডোপিং পরীক্ষার অনীহাই প্রমাণ করে যে সেনেগালের সেই জয়টি ‘প্রাকৃতিক’ উপায়ে অর্জিত হয়নি।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ও ভবিষ্যতের অপেক্ষা

বর্তমানে পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতের দিকে। শিরোপা বাতিলের বিরুদ্ধে সেনেগালের আপিল এবং এই নতুন ডোপিং অভিযোগ—সব মিলিয়ে এক জটিল আইনি লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। যদি ডোপিং টেস্ট এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সেনেগালের আপিল তো টিকবেই না, উল্টো তাদের বড় ধরনের জরিমানাসহ দীর্ঘমেয়াদী নির্বাসন ভোগ করতে হতে পারে। ওয়াডা-র প্রতিক্রিয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে সেনেগালের ভাগ্যের চাবিকাঠি।

জয় যখন পরাজয়ের চেয়েও গ্লানিমাখা

ফুটবল কেবল গায়ের জোর বা কৌশলের খেলা নয়, এটি নিয়মানুবর্তিতা ও সততারও প্রতীক। সেনেগাল যদি সত্যিই মাঠ বর্জন এবং ডোপিং টেস্ট ফাঁকির মতো কাজ করে থাকে, তবে তাদের সেই ১-০ ব্যবধানের জয়টি ইতিহাসের পাতায় গ্লানি হয়েই থাকবে। আফ্রিকান ফুটবলে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সিএএফ ও ফিফার কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। রাবাতের সেই রাতের রহস্য ভেদ না হওয়া পর্যন্ত সেনেগালের ফুটবল আকাশ থেকে বিতর্কের মেঘ সরছে না।


এ জাতীয় আরো খবর...