রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রীই কেবল ‘ফার্স্ট লেডি’—বইয়ের পাতার এই পুরোনো সংজ্ঞাকে যেন বাস্তবতার নিরিখে নতুন করে লিখছে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ। সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শীর্ষ নেতাদের স্ত্রীদের ভূমিকা অনেকটা ছায়াসঙ্গী বা গৃহবধূর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক শীর্ষ পদে থাকা নেতাদের স্ত্রীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তারা ছিলেন মূলত স্বামীদের অনুগামী। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের দৃশ্যপটে এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান নিজের মেধা, প্রজ্ঞা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে যে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

প্রোটোকলের গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন রূপরেখা
রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হলেন ‘অফিসিয়াল ফার্স্ট লেডি’। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় বলা হয় ‘স্পাউস অব দ্য প্রাইম মিনিস্টার’। তবে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রাষ্ট্রের মূল নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা হয়ে ওঠে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্রান্স বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে আমরা দেখি, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীরা কার্যত ফার্স্ট লেডির মতোই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। বর্তমানে বাংলাদেশেও ঠিক সেই আন্তর্জাতিক চর্চারই প্রতিফলন ঘটছে। ডা. জুবাইদা রহমান কেবল প্রটোকলের বেড়াজালে নিজেকে আটকে না রেখে, হয়ে উঠেছেন দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এক নতুন ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’।
শেকড়ের সন্ধানে: এক বর্ণাঢ্য পারিবারিক ইতিহাসের উত্তরাধিকার
ডা. জুবাইদা রহমানের এই আত্মবিশ্বাসী ও দৃপ্ত পদচারণার পেছনে রয়েছে এক বিশাল ও সমৃদ্ধ পারিবারিক ইতিহাস। অনেকেই মনে করেন, কেবল স্বামী তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি পরিচিত নন, বরং নিজস্ব বংশগত আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের দিক থেকে তাঁর শেকড় অনেক বেশি গভীরে প্রোথিত। ১৯৭২ সালের ১৮ জুন পুণ্যভূমি সিলেটের এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পারিবারিক ইতিহাস ঘাঁটলে উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক রথী-মহারথীর নাম উঠে আসে:
বাবা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান: তিনি কেবল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন সফল প্রধান (১৯৭৯-১৯৮৪) ছিলেন না, এরশাদ সরকারের আমলে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে যোগাযোগ ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
দাদা আহমেদ আলী খান: ১৯০১ সালে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করা এই প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছিলেন আসাম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট এবং তৎকালীন আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ)।
চাচা ও পরদাদা: মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানী এবং বাংলাদেশের সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন জুবাইদা রহমানের চাচা। আর ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম বিচারপতি এবং প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন তাঁর পরদাদা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে যোগসূত্র: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব এবং জাতিসংঘের বর্তমান স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার আইরিন জুবাইদা খান তাঁর আপন চাচাতো বোন।
কূটনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং সামাজিক নেতৃত্বের যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, তা যেন জন্মসূত্রেই ডা. জুবাইদা রহমানের ধমনিতে প্রবাহিত। ১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জিয়া পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্ধনকে এক নতুন মাত্রা দেয়।
মেধা ও মননের মেলবন্ধন: একজন পেশাদার চিকিৎসক
ডা. জুবাইদা রহমানকে কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি প্রথমত একজন অত্যন্ত মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসা বিজ্ঞানী। দেশের শীর্ষ চিকিৎসাবিদ্যা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত ‘লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজ’ থেকে মেডিসিন বিষয়ে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে ১৯৯৫ সালে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন তিনি। তাঁর এই শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং গবেষণাধর্মী কাজ তাঁকে এক ভিন্নমাত্রার পেশাদারিত্ব দিয়েছে। তিনি এমন একজন ফার্স্ট লেডি, যিনি বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিশ্লেষণ করতে জানেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাপুটে পদচারণা ও হোয়াইট হাউসের মঞ্চ
গতানুগতিক ফার্স্ট লেডিদের আমরা মূলত ঘরোয়া অনুষ্ঠান, ফিতা কাটা বা দাতব্য কাজের আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু ডা. জুবাইদা রহমান সেই ছক ভেঙে দিয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের বিশেষ আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে ‘ফস্টারিং দ্য ফিউচার টুগেদার গ্লোবাল কোয়ালিশন সামিট’-এ তাঁর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।
এই বৈশ্বিক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি; বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অধিকার এবং শিক্ষার আধুনিকায়ন নিয়ে অত্যন্ত জোরালো ও নীতিনির্ধারণী বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর ভাষণের একটি উক্তি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়, যেখানে তিনি বলেন—”প্রত্যেক জাতির ভবিষ্যৎ তার শিশুদের জীবনের গল্পে লেখা থাকে।” সবচেয়ে বিস্ময়কর ও দূরদর্শী ব্যাপার ছিল, শিশুশিক্ষায় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (AI) বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে তাঁর তথ্যবহুল আলোচনা। বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের স্ত্রীর সরাসরি বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ ও যুগোপযোগী সংলাপ সত্যিই এক বিরল ঘটনা।
দেশীয় রাজনীতিতে ‘সফট পাওয়ার’ ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব
দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও নিজের মেধার ছাপ রাখতে শুরু করেছেন। তিনি মূলত ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় কূটনীতির চর্চা করছেন। পেশাজীবীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অত্যন্ত নিবিড়। বিশেষ করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মতো পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর হাতিরঝিলে পেশাজীবীদের এক বিশাল সম্মেলনে তাঁর দেওয়া প্রথম রাজনৈতিক ভাষণটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দারুণভাবে চমকে দেয়। আক্রমণাত্মক বা নেতিবাচক কোনো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, বরং তিনি কথা বলেছিলেন অত্যন্ত পরিমিত, ধীরস্থির ও যৌক্তিক ভাষায়। তিনি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং একটি সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ—সবার কাছেই দারুণ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
কী কারণে তিনি অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডা. জুবাইদা রহমানের স্বাতন্ত্র্য মূলত তিনটি মজবুত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
১. বিজ্ঞানমনস্কতা ও পেশাদারিত্ব: একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কাজের মধ্যে আবেগ নয়, বরং যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য দেখা যায়। জনস্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর প্রস্তাবনাগুলো অত্যন্ত আধুনিক এবং প্রায়োগিক।
২. আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক ভাষা আয়ত্ত করা: দীর্ঘদিনের লন্ডন জীবন এবং আইরিন খানের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পারিবারিক যোগসূত্রের কারণে তিনি বৈশ্বিক কূটনীতির ভাষা খুব সহজেই রপ্ত করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
৩. মার্জিত নেতৃত্বগুণ ও ব্যক্তিত্ব: তিনি ক্ষমতার দম্ভ দেখান না। তাঁর বাচনভঙ্গি অত্যন্ত বিনয়ী কিন্তু আত্মবিশ্বাসী। শিক্ষা, শিশু উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোকে তিনি তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন, যা একজন আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রদূতের প্রতিচ্ছবি।

বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে তারেক রহমান যেমন ধীরে ধীরে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন, ঠিক তেমনি ডা. জুবাইদা রহমানও কি ভবিষ্যতে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে আবির্ভূত হবেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মহাকালই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘ফার্স্ট লেডি’ বা সরকারপ্রধানের স্ত্রী হওয়ার যে পুরোনো ধ্যানধারণা ছিল, ডা. জুবাইদা রহমান চিরতরে তার মাপকাঠি বদলে দিয়েছেন।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে হয়তো আমরা এমন অনেক যোগ্য নারীর দেখা পাব, যারা আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সাহায্য করেছেন। কিন্তু একুশ শতকের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে দাঁড়িয়ে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ‘ব্র্যান্ডিং’ তৈরি করতে এবং সমকালীন বিশ্বমঞ্চে স্বদেশের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে ডা. জুবাইদা রহমানের চেয়ে যোগ্য, মার্জিত ও উপযুক্ত উদাহরণ হয়তো এই মুহূর্তে আর দ্বিতীয়টি নেই। তিনি শুধু একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির সহধর্মিণী নন, মেধা ও মননের আলোকবর্তিকায় তিনি স্বীয় পরিচয়েই অনন্যা।
সূত্র: