বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে প্রতিবছর ‘পুলিশ সপ্তাহ’ এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অসীম সাহসিকতা, মামলার রহস্য উদঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলামূলক আচরণের স্বীকৃতিস্বরূপ সদস্যদের দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম) ও ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ (পিপিএম)। কিন্তু ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহকে কেন্দ্র করে ঘোষিত পদকপ্রাপ্তদের তালিকা নিয়ে খোদ পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই বইছে সমালোচনার ঝড়। অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্তি, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ‘তদবির সিন্ডিকেটে’ অনেক যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ ও হতাশা।
আগামী রোববার রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহে ১০৯ জন বিপিএম ও পিপিএম পদকপ্রাপ্তদের বুকে পদক পরিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এই চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের অন্দরেও অস্বস্তি তৈরি করেছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে রাজনৈতিক কানেকশন ও তদবিরের মাধ্যমে পদক বাগানো হতো, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও সেই সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মাঠ পর্যায়ের অনেক সদস্য আক্ষেপ করে বলেছেন, যারা দিনরাত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন, তারা পদকের ধারেকাছেও যেতে পারেননি। অথচ যারা প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ‘আস্থাভাজন’ হিসেবে পরিচিত কিংবা যাদের রাজনৈতিক ‘খুঁটির জোর’ রয়েছে, তারাই এই সম্মানজনক পদকের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। একে ‘সোনার হরিণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বঞ্চিতরা বলছেন, পুলিশ পদক এখন কেবল মেধার নয়, বরং তদবিরের মাপকাঠিতে নির্ধারিত হচ্ছে।
পদক প্রদান কমিটির সভাপতি ও অতিরিক্ত আইজিপি (অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, পদক কমিটি অত্যন্ত সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করেছে। কারো কোনো তদবির শোনা হয়নি এবং শুধুমাত্র যোগ্যরাই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র ও ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি এই বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পদক না পাওয়ার যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা। জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী বিশৃঙ্খল সময়ে যখন পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল, তখন তিনি ও তাঁর দল ক্লুলেস অসংখ্য মামলার রহস্য উদঘাটন করেছেন। একটি বিশেষ অভিযানে তিনি একই সঙ্গে আটটি খুনের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হন। সাহসিকতা ও দক্ষতার এই চূড়ান্ত নিদর্শনের পরও তাঁর ভাগ্যে পিপিএম জোটেনি।
ওই কর্মকর্তা ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে বলেন, “আমাদের চোখের সামনেই অনেকে রাজনৈতিক তদবিরে বিপিএম-পিপিএম পদক বাগিয়ে নিলেন। অথচ আমাদের কোনো লবিং করার লোক না থাকায় টিমের একজনও পদক পেল না। যারা পদক পেয়েছেন, তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের আমলে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন ছিলেন। এখন তারা ‘জেলা কোটা’ বা ‘বিএনপি পরিবারের সদস্য’ কোটা ব্যবহার করে বহাল তবিয়তে আছেন এবং দাপটের সঙ্গে পদক নিচ্ছেন।”
পুলিশের ভেতরে পদক নিয়ে রাজনীতির চিত্রটি দীর্ঘদিনের। একজন পুলিশ সুপার মর্যাদার কর্মকর্তা জানান, ২০১৮ সালে তিনি যখন সহকারী পুলিশ সুপার ছিলেন, তখন একটি জেলায় ডাকাত ও সন্ত্রাস দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর সাহসিকতা ও সাফল্যের জন্য বিপিএম পদকের আবেদন করলেও তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁর নাম কেটে দেন। মজার ব্যাপার হলো, ওই কর্মকর্তা জুনিয়রের সেই সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে নিজেই পদকটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে তিনি এবার আর আবেদনই করেননি। তিনি আশা করেছিলেন, নতুন সরকার বা নতুন কাঠামোর অধীনে অন্তত নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে, কিন্তু ফলাফল সেই ‘আগের মতো’ই রয়ে গেছে।
ডিএমপির একটি থানার ওসি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন তদন্ত কর্মকর্তাও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, মাঠ পর্যায়ে যারা প্রকৃত অর্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাস দমন বা মাদক উদ্ধারের কাজ করেন, তাদের নাম তালিকার নিচে পড়ে থাকে। চট্টগ্রামের ওই কর্মকর্তা বলেন, “একটি আলোচিত মামলার তদন্ত সফলভাবে শেষ করেও আমি পদক পেলাম না। অথচ আমার সেই সাফল্যের অংশীদার দাবি করে আমার এক ‘স্যার’ পদক পাচ্ছেন।” এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভালো কাজের পুরস্কার হিসেবে পদক পাওয়ার পরিবর্তে অনেককে রহস্যজনকভাবে বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পিবিআই-এর এক কর্মকর্তা জানান, সারা বছর পরিশ্রমের পর তিনি আশা করেছিলেন বিপিএম বা পিপিএম পাবেন, কিন্তু তাঁর জুটেছে কেবল ‘আইজিপি ব্যাজ’। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “তদবির করতে পারলে হয়তো পদকটা জুটত।”
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এবারের মনোনীত ১০৯ জনের মধ্যে ১১ জনই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদক পেয়েছিলেন। এমনকি কেউ কেউ এর আগে দুইবারও পদক পেয়েছেন। তালিকায় এমন এক কর্মকর্তার নাম রয়েছে যিনি কথিত জঙ্গি দমনে ‘সফলতা’ দেখিয়ে পদক পেয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত আইজিপির ‘ভাগনে কোটায়’ পুনরায় পদক পাচ্ছেন।
তালিকায় সবচেয়ে বিতর্কিত নাম হিসেবে উঠে এসেছে এক ডিআইজি-র নাম, যিনি গত জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার ঘটনায় বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এমন বিতর্কিত ব্যক্তির পদক পাওয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অস্বস্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এবারের তালিকায় যারা স্থান পেয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার
ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গণি
র্যাব ১২-এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়া
ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আতিকুজ্জামান
এছাড়াও তালিকায় রয়েছেন ডিএমপির পরিদর্শক মো. জেহাদ হোসেন, এসআই গোলাম মূর্তজা, ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মো. রফিক এবং কনস্টেবল মো. রিমন হোসেনসহ আরও অনেকে।
পুলিশ পদক নিয়ে এই বিতর্ক কেবল পুরস্কারের লড়াই নয়, এটি বাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রশ্ন। যখন একজন মাঠ পর্যায়ের সদস্য দেখেন যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার চেয়ে ঊর্ধ্বতনদের তোয়াজ করা বা রাজনৈতিক খুঁটি খোঁজা বেশি ফলপ্রসূ, তখন বাহিনীর পেশাদারিত্ব ধূলিসাৎ হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, প্রতিটি নাম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করা হয়েছে এবং কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের বিপুল সংখ্যায় ক্ষোভ ও আক্ষেপ এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
পুলিশ বাহিনীকে যদি সত্যিই একটি সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে বিপিএম ও পিপিএম-এর মতো জাতীয় সম্মাননাগুলোকে তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হলে দক্ষ কর্মকর্তারা কাজের উৎসাহ হারাবেন এবং পুলিশ সপ্তাহ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর (৭ মে, ২০২৬) এবং পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্র।