শিরোনামঃ
টিনএজের যে দোষগুলো আসলে গুণ আগামীকাল দেশজুড়ে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন: যা জানা জরুরি ভারতের মেডিকেল কলেজে ক্লাস নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের পলাতক সাবেক এমপি কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি: সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ ৫ জনের রায় কাল ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ৯২০ ছাড়াল, নতুন কম্পনে আতঙ্ক ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি: হিজবুল্লাহর তীব্র বিরোধিতা ইতালিতে এক পরিবারের তিন সদস্যকে ছুরিকাঘাতে হত্যা: শোকের ছায়া কোম্পানীগঞ্জে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে ফের শুরু বেক্সিমকো ফার্মার লেনদেন গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামির দা’র কোপে আহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা শান্তিচুক্তির ‘প্রকাশ্য লঙ্ঘন’ করছে যুক্তরাষ্ট্র: ইরান
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন

নেপথ্যের অনুচ্চারিত নায়িকারা…

বাদল সৈয়দ / ২৯ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

একশ বছরেরও বেশি সময় আগে আমার দাদি চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে ক্লাস ফোর/ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলেন।
এ বিরল ঘটনার পেছনে একটি কারণ আছে। তাহলো, তাঁর মামা ছিলেন রেঙ্গুনে শিক্ষা বিভাগে কাজ করতেন।
তিনি নিজ গ্রামে একটি বালিকা বিদ্যালয় দিয়েছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে গ্রামবাসীরা তাঁদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে রাজি হলেন না। দাদির মামা তখন তাঁর বর্ধিত পরিবারের মেয়েদের সে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেই সূত্রে দাদির স্কুলে যাওয়া।
মজার ব্যাপার হলো— আমার দাদার কিন্তু কোনো পড়ালেখা ছিল না। তিনি ছিলেন মোটামুটি সম্পন্ন কৃষক।
বিয়ের পর দাদি একটি অদ্ভুত আবদার করলেন।
তাহলো, তিনি দেখতেন, দাদা প্রতিদিন ভোরে কামলাদের নিয়ে ক্ষেতে কাজ করতে যান। ব্যাপারটা তাঁর পছন্দ হতো না।
তখন চট্টগ্রামের লোকজন ব্যবসা করার জন্য বার্মা যেতেন। তাঁরা অনেকেই সেখানে দ্বিতীয় বিয়ে করতেন। তাই কারো স্ত্রী চাইতেন না তাঁর স্বামী বার্মা যান। দাদি করলেন ভিন্ন আবদার— তাহলো, তিনি দাদাকে ব্যবসা করার জন্য বার্মা যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। যেখানে কোনো মেয়ে স্বামীকে বার্মা যেতে দিতে চান না, সেখানে স্ত্রীর এই আবদার শুনে দাদা আকাশ থেকে পড়লেন।
তিনি বললেন— ‘আমার তো তেমন অভাব নেই, বার্মা যাব কেন?’
দাদি উত্তর দিলেন— ‘কারণ আপনি ক্ষেতখামার নিয়ে পড়ে থাকলে, আমার ছেলেরাও তাই করবে। আমি চাই তারা পড়াশোনা করে চাকরিবাকরি করুক।’
‘কিন্তু ওখানে নাকি রঙিলা মেয়েরা সবার মন ভুলিয়ে দেয়।’ দাদা বললেন।
‘ওটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। নিজের ঈমান ঠিক রাখার দায়িত্ব আপনার। আমার শেষ কথা হলো, আপনাকে বার্মা যেতে হবে, ব্যবসা করতে হবে।’
‘অতো দূরদেশে গিয়ে ব্যবসা না করে এখানেই করি?’
‘বার্মায় ব্যবসা-বাণিজ্যের যে সুযোগ আছে তা এখানে নেই। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার পেছনে সামনে অনেক খরচ হবে। আপনার বর্তমান আয়ে তা সম্ভব নয়। তাই রোজগার বাড়াতে হবে।’
তাঁর জেদের কাছে দাদা হার মেনে বার্মার আকিয়াব শহরে গিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন।
কিছুদিন পর তিনি দাদির চিঠি পেলেন। তাতে তিনি অন্য আবদার করেছেন, তাহলো—
‘আমি চাই আমার ছেলেরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তাই আমি তাদের আমার ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে চাই। সেখানে সবাই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, তাই ওদের তা পড়তে সমস্যা হবে না। আপনি সত্ত্বর ব্যবস্থা নিন।’
দাদা প্রথমে আপত্তি করলেও তিনি শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর আবদার ফেলতে পারতেন না।
কিছুদিন পর আমার আব্বা ও মেঝো চাচা পটিয়ায় তাঁদের মামা বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। সেখানে তারা ‘আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে’ ভর্তি হলেন।
কয়েক বছর পর দাদি ছোটো চাচাকে ঢাকায় আমার মেজ ফুপুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন— তখন তাঁর ধারণা হয়েছে ঢাকায় আরও ভালো পড়াশোনা হয়।
তিনি তাঁর মেয়েদেরও স্কুলশিক্ষিত করলেন।
এভাবেই আমাদের পরিবারে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন হলো। শুনেছি, এটা নিয়ে গ্রামে অনেক হল্লা হয়েছিল— দাদা খুব শক্ত হাতে তা সামলেছিলেন।
ছেলেরা যখন বড় হলো তখন দাদি তাদের ডেকে বললেন— ‘তোরা পড়াশোনা শেষ করে শহরে চলে যাবি। নয়তো তোদের ছেলেমেয়েরা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে না।’
এতেও দাদার অনিচ্ছা ছিল—
কিন্তু দাদি তাঁর জেদে অটল রইলেন।
দাদা আবার হার মানলেন।
মায়ের আদেশ অনুযায়ী আব্বা এবং চাচারা শহরে সেটেল করলেন। সবাই চাকরিতে যোগ দিলেন।
এভাবেই একশ বছরেরও আগে জন্ম নেওয়া এক নারী তাঁর ভবিষ্যৎ বংশধরদের জীবন পালটে দিয়েছিলেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন— অসংখ্য নাতি-পুতিও বর্তমানে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।
একটি কথা প্রচলিত আছে—
“Behind every family’s success, there is an unsung woman.”
‘প্রতিটি সফল পরিবারের পেছনে একজন নারী লুকিয়ে থাকেন— যার কথা উচ্চারিত হয় না।’
আমার দাদিও ঠিক তেমন একজন অনুচ্চারিত মহিলা— যার ভয়ংকর জেদ না থাকলে হয়তো আপনি আজ আমার লেখাটি পড়তে পারতেন না।
মা দিবসে সকল অনুচ্চারিত নেপথ্য নায়িকাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি প্রশ্ন করি—
আপনার পরিবারে এরকম নেপথ্য নায়িকা কে?
আমার দাদির জন্য দোয়া করবেন।
পাদটীকাঃ দাদা প্রায়ই দাদির এসব জেদ নিয়ে গল্প করতেন। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— ‘আপনি তো খুব রাগী মানুষ, কিন্তু দাদির সব কথা শুনেন কেন?’ তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন— ‘কারণ তাঁর এক দাঁতের বুদ্ধিও আমার নাই।’


এ জাতীয় আরো খবর...