দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বিশাল সুখবর নিয়ে আসছে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় আগামী ১ জুলাই থেকে অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতেই এই বহুল প্রতীক্ষিত পে-স্কেল কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির মারাত্মক প্রভাবের কথা মাথায় রেখে এই বিশাল আর্থিক বোঝা একবারে না চাপিয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করার একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। গত সপ্তাহে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অর্থমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বাজেট-সংক্রান্ত একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলোর মতে, প্রস্তাবিত এই সম্পূর্ণ পে-স্কেল যদি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে সরকারের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের এই সময়ে হঠাৎ করে বাজারে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের সরবরাহ মূল্যস্ফীতিকে চরম মাত্রায় উসকে দিতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে আসছিলেন। সেই চরম ঝুঁকি এড়াতেই সরকার তিন ধাপে বেতন বাড়ানোর এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মেগা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বাড়তি বরাদ্দ রাখার জোর প্রস্তুতি চলছে। এর ফলে, আগামী জুলাই মাস থেকেই সরকারি কর্মচারীরা তাদের বর্ধিত মূল বেতনের (বেসিক) ৫০ শতাংশ হাতে পাবেন।
পরবর্তীতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্বিতীয় ধাপে মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। এরপর চূড়ান্ত বা তৃতীয় ধাপে গিয়ে চিকিৎসা, বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ও আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধাগুলো নতুন স্কেল অনুযায়ী সমন্বয় করে পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামোটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হবে। অর্থ বিভাগ ও নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ধাপে ধাপে এই বেতন বাড়ানোর ফলে একদিকে যেমন বিশাল বাজেট ঘাটতির চাপ সামলানো সরকারের জন্য অনেক বেশি সহজ হবে, অন্যদিকে বাজারে একসঙ্গে বিপুল টাকার প্রবাহ না বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত খাঁড়া নেমে আসবে না।
নতুন এই বেতন কাঠামোর খসড়া রূপরেখা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তবে বেতনের অঙ্কে আসছে এক অভাবনীয় উল্লম্ফন। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশনের গত ২১ জানুয়ারি জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বনিম্ন স্তরের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে একলাফে ২০ হাজার টাকা করার যুগান্তকারী সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে সর্বোচ্চ স্তরের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করা হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, এই কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে গ্রেডভেদে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বেতন বৃদ্ধি।
বর্তমানে এই বিপুল সংখ্যক সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্তদের নিয়মিত বেতন-ভাতা মেটাতেই সরকারের বার্ষিক খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বিশাল আকার ধারণ করবে। তাই সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি যেন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য কোনো বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন অর্থ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।