শিরোনামঃ
চল্লিশের পর নারীর সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা: ৮টি পরামর্শ ফাহাদ রহমানের মুকুটে যুক্ত হলো দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম সায়নীর শিরশ্ছেদের জন্য ১ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা, বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রামিসা হত্যার দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেবে পুলিশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: কৃষিমন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সরকার যতদিন চাইবে, মাঠে থেকে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ৯ মাস লাগবে ইবোলার টিকা আসতে: ডব্লিউএইচও আড়াইহাজারে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ আটক ৩
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ১০:১১ অপরাহ্ন

ভারতে মুসলিমদের ওপর নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর সহিংসতা, বৈষম্য ও নির্যাতনের অভিযোগ কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এবং বিশেষভাবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর এই পরিস্থিতি এক চরম ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কয়েক দশক ধরে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক হামলা, ঘৃণামূলক বক্তব্য, বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ এবং তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হয়ে আসছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর গভীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা, মৌলিক নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর। বিশেষ করে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা, সহিংসতা ও প্রকাশ্য নিপীড়নের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে ধর্মীয় বিভাজনকে একটি সুকৌশলী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা গভীর হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, আইনের সমান সুরক্ষা এবং সামাজিক সম্প্রীতি জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত করা না হলে এই সংকট অচিরেই আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরের আকার নিতে পারে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে আটকে নেই, বরং এটি বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবাধিকার আলোচনার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ভয়াবহ হামলা, নির্যাতন ও অর্থনৈতিক বয়কট

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরবর্তী মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজ্যজুড়ে শতাধিক ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ভারতের অন্যতম পরিচিত মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর)-এর এক বিস্তারিত ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও আক্রমণের শিকার হিসেবে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ৪ থেকে ৭ মে পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত এসব ঘটনায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষ, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গবাদি পশুর হাটগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে নারকীয় হামলার অভিযোগ উঠেছে।

এপিসিআর-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সহিংসতার ধরন ছিল বহুমুখী ও সুপরিকল্পিত। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সম্পত্তিতে হামলা, প্রকাশ্যে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, সুসংগঠিত অর্থনৈতিক বয়কট, সংখ্যালঘু মালিকানাধীন দোকানপাট ও পরিবহন ব্যবস্থায় বেপরোয়া আঘাত, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তির আদলে ‘বুলডোজার’ ব্যবহারের মতো ঘটনাও। এসব হামলায় অন্তত শতাধিক মুসলিম শারীরিক বা মানসিকভাবে চরম নিগৃহীত হয়েছেন এবং শতাধিক ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সম্পত্তি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি, ধর্মীয় উপাসনালয় বা মসজিদ, ক্ষুদ্র দোকান এবং মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

সহিংসতার আগুন কেবল এখানেই থেমে থাকেনি। সম্পত্তি ধ্বংসের পাশাপাশি অসংখ্য যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্থাপনায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এক রাতেই পথে বসে যাচ্ছে এবং অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়ছে। জীবন বাঁচাতে অনেকেই তাদের পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ও জন্মস্থান ছেড়ে অন্য এলাকায় বা রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ‘অর্থনৈতিক বয়কট’ ও সামাজিক চাপ সৃষ্টির এক অভিনব ও নিষ্ঠুর কৌশল। মুসলিম মালিকানাধীন দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা বন্ধ করতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে নির্দেশ বা প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে। মুসলিম শ্রমিকদের কর্মসংস্থান থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে বা সাধারণ বাজারে তাদের অংশগ্রহণে অলিখিত বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি রাতের অন্ধকারে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়া, অবিলম্বে এলাকা ছাড়তে চাপ প্রয়োগ করা বা কাল্পনিক গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করার মতো জঘন্য কাজগুলো চলছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলো নিছকই রাজনৈতিক প্রতিশোধের বীভৎস অংশ।

ভৌগোলিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এই সহিংসতা পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই, বরং তা বিভিন্ন জেলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কোচবিহার ও উত্তর ২৪ পরগনায় সবচেয়ে বেশি ও ভয়াবহ ঘটনা ঘটলেও রাজধানী কলকাতা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা ও বীরভূমসহ বিভিন্ন জেলায় এই সহিংসতার আঁচ তীব্রভাবে লেগেছে। ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী সামান্য কয়েকটি এলাকা ছাড়া প্রায় পুরো রাজ্যেই কমবেশি এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বলে এপিসিআর-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সংঘর্ষ নয়, বরং একটি বৃহত্তর, সুপরিকল্পিত ও দেশব্যাপী ছড়ানো বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

রাজনৈতিক দোষারোপ ও টার্গেটেড ভায়োলেন্স

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই সহিংসতার দায় একে অপরের ওপর চাপাতে ব্যস্ত। রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর বিজয়ী বিজেপি-সংশ্লিষ্ট উগ্র সমর্থকরা রাজ্যজুড়ে এই নারকীয় সহিংসতা চালিয়েছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, অনেক স্থানে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের উপস্থিতিতেই মুসলিমদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বলা হয়েছে, এটি পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ও বিরোধী রাজনৈতিক সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি নগ্ন চেষ্টা। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাগুলোকে সরাসরি “টার্গেটেড ভায়োলেন্স” বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক সহিংসতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের রহস্যময় নীরবতা এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চরম ব্যর্থতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন। এই অব্যাহত হামলার কারণে বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের ঐক্যের সংস্কৃতি ও সামাজিক ভারসাম্যের জন্য একটি অতিকায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাস্তায় নামাজ পড়া নিষিদ্ধ ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আগুনে ঘি ঢালার মতো আরও উত্তপ্ত করে তোলে প্রভাবশালী বিজেপি নেতা অর্জুন সিংয়ের একটি বিতর্কিত বক্তব্য। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাস্তায় বা উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। যদিও পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে সরকারিভাবে এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি, তবুও একজন শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

সংবিধান অনুযায়ী ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিটি নাগরিকের একটি অলঙ্ঘনীয় মৌলিক অধিকার। কিন্তু উগ্র রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুশীলনকে বারবার বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হচ্ছে। ঐতিহাসিক মসজিদ দখলে নিয়ে সেখানে মন্দির নির্মাণের রাজনীতি, মুসলিম নারীদের হিজাব পরা নিয়ে আইনি ও সামাজিক বাধা সৃষ্টি, আজানের ধ্বনি নিয়ে বিতর্ক তৈরি এবং সর্বশেষ উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়ার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞার দাবি—এসব প্রতিটি বিষয়কে একেকটি তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা হয়েছে। এর ফলে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ঘৃণার বীজ অত্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে।

পশু জবাই নিষিদ্ধকরণ: খাদ্যভ্যাসে আঘাত ও নতুন হাতিয়ার

ভারতে গরু জবাইকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ধর্ম, রাজনীতি ও সামাজিক আবেগের এক চরম সংবেদনশীল ও মিশ্র বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে। হিন্দু ধর্মে গরুকে অত্যন্ত পবিত্র প্রাণী হিসেবে ভক্তি করা হয় বলে এই জবাই নিষেধাজ্ঞাকে অনেকেই ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিশ্বাস রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে জোরালো সমর্থন করেন। কিন্তু অন্যদিকে মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত এবং কিছু পশুপালননির্ভর দরিদ্র জনগোষ্ঠী মনে করে, এই ধরনের আইন তাদের আবহমানকালের খাদ্যাভ্যাস, জীবিকা, পেশা এবং সর্বোপরি ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর সরাসরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে গরুসহ বিভিন্ন ধরনের পশু জবাই সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যা রাজ্যজুড়ে এক বিশাল বিতর্কের ঝড় তুলেছে। নতুন এই কড়াকড়ি নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত সরকারি অনুমোদন ও ফিটনেস সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড়, মহিষসহ কোনো পশু জবাই করা যাবে না। নিয়ম ভঙ্গ করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড অথবা বিপুল অঙ্কের অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

নির্দেশনার সবচেয়ে জটিল অংশ হলো পশু জবাইয়ের পূর্বশর্তগুলো। জবাইয়ের আগে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ বা পঞ্চায়েত এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথ স্বাক্ষরিত ফিটনেস সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই সনদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং সেটি আর কৃষিকাজ, ভারবহন বা প্রজননের কোনোভাবেই উপযোগী নয়। অথবা পশুটি কোনো গুরুতর আঘাত, দুরারোগ্য অসুস্থতা কিংবা স্থায়ী অক্ষমতার কারণেই কেবল জবাইযোগ্য অবস্থায় উপনীত হয়েছে। অনুমোদিত পশু শুধুমাত্র প্রশাসনের নির্ধারিত কসাইখানা বা নির্দিষ্ট স্থানে জবাই করা যাবে। খোলা জায়গা, রাস্তা বা জনসমাগমস্থলে পশু জবাই করলে তা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই নিয়ম বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য হলো জনস্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও শহুরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তবে সমালোচকরা এটিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন। অনেকেই বলছেন, এটি সরাসরি মুসলিম সম্প্রদায়ের কোরবানির মতো ধর্মীয় রীতি এবং তাদের দৈনন্দিন মাংসের ব্যবসার ওপর একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক আঘাত। অনেকের মতে, মুসলিমদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করা এবং তাদের ওপর আইনি নির্যাতন চালানোর একটি নতুন ও মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে এই আইনকে সুকৌশলে তৈরি করেছে বিজেপি।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ও নাগরিকত্বের সংকট

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় “হিন্দুত্ব” কেবল আর একটি তাত্ত্বিক আদর্শ বা দর্শন নয়; এটি আজ একটি সুসংগঠিত, আক্রমণাত্মক এবং রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তাদের আদর্শিক গুরু আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে “হিন্দু রাষ্ট্র” হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখে আসছে, বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ তারই বাস্তব রূপায়ণ।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০২ সালের রক্তক্ষয়ী গুজরাট দাঙ্গা, ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস, বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), এবং কাল্পনিক “লাভ জিহাদ” তত্ত্ব—ভারতের রাজনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলমানদেরকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা হয়েছে। সমালোচক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে মুসলমানদের চরম ভয় দেখিয়ে বিজেপিতে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনও ভয়াবহ অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, তৃণমূল সমর্থিত মুসলিমরা যদি ভোটকেন্দ্রে যায়, তবে তাদের সপরিবারে হত্যা করা হবে। এই প্রাণভয়ে অসংখ্য মুসলিম ভোটার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। আর যারা সাহসের ওপর ভর করে ভোট দিতে গেছেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তাদের ওপরই নেমে এসেছে সবচেয়ে নির্মম নির্যাতন।

নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের এই সংকট মুসলমানদের জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে (সিএএ) প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিমদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও, মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। এটি যে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিপন্থী, তা নিয়ে শাহিনবাগসহ সারা দেশে ঐতিহাসিক আন্দোলন হলেও সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মুসলমানরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, এটি মূলত তাদের হাজার বছরের নাগরিক পরিচয়কে আইনিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার একটি রাষ্ট্রীয় ব্লু-প্রিন্ট।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনআরসি আতঙ্ক। বহু দরিদ্র, অশিক্ষিত ও প্রান্তিক মানুষ, যাদের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাসের কোনো দাপ্তরিক প্রামাণ্য দলিল নেই, তারা আজ নিজেদের নিজ দেশেই “রাষ্ট্রহীন” হয়ে পড়ার অজানা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ প্রথম সারির একাধিক বিজেপি নেতার মুখে মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘উইপোকা’ বলে দেশ ছাড়ার প্রকাশ্য হুমকি এই আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সম্প্রতি যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা এই বৃহত্তর মুসলিম-বিতাড়ন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।

গণমাধ্যম ও প্রোপাগান্ডার বিষাক্ত জাল

বর্তমান সময়ে ভারতের রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর ফ্রন্ট লাইন হলো ‘তথ্য যুদ্ধ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেলগুলোকে ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত ভুয়া খবর, সাম্প্রদায়িক গুজব এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চোখের পলকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ভারতের মূলধারার বেশ কিছু বড় গণমাধ্যম বা ‘গোদি মিডিয়া’র বিরুদ্ধেও চরম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। প্রাইম টাইম টেলিভিশন টকশোগুলোতে প্রায়ই মুসলিমদের নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে সংখ্যাগুরু হিন্দু জনমতকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের প্রতিনিয়ত “দেশদ্রোহী”, “পাকিস্তানের চর”, “অনুপ্রবেশকারী”, “জিহাদি” ইত্যাদি অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম প্রতিবেশীদের মধ্যেও পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়ে বিভাজনের এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

ভারতের অভ্যন্তরীণ এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্তাপ কেবল তাদের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আটকে নেই, এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতের এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে টালবাহানা, অসম বাণিজ্য বৈষম্য এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপের পুরনো অভিযোগের পাশাপাশি এখন নতুন করে ভারতের এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতি এ দেশের মানুষের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের অভ্যন্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বিদ্বেষ ও নির্যাতন যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে তার সরাসরি ও অনিবার্য ক্ষতিকর প্রভাব দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর গিয়ে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শান্তি বজায় রাখতে হলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সমমর্যাদার সম্পর্ক বজায় রাখা একান্ত অপরিহার্য। কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যদি আঞ্চলিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর ছড়ি ঘোরায়, তবে তা শুধু ভারত বা বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভবিষ্যতের জন্যই এক ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

একইসঙ্গে বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে। নির্বাচনের পর ভারতের মতো বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দাবিদার দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং প্রথম সারির পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। তারা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ভারতের সামাজিক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মতো সংস্থাকে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে।

যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরের মতোই এসব আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনকে ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দেয় এবং দাবি করে যে ভারতীয় সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে; তবুও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের উচিত নিজেদের সংখ্যালঘু নাগরিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা। তারা নিয়মিত আন্তর্জাতিক সংলাপ, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এবং বাস্তব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার জোরালো আহ্বান জানাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নির্বাচন পরবর্তী ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিমরা আজ এক চরম বিভীষিকাময় ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কালক্ষেপণ করছেন। একদিকে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক আইন, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ উগ্রবাদীদের দৈনন্দিন হামলা—এই দ্বিমুখী সাঁড়াশি আক্রমণে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যসূত্র: শীর্ষনিউজ


এ জাতীয় আরো খবর...