টানা সাড়ে পনেরো বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক দলটির অভাবনীয় পতন ঘটেছিল, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো নিজেদের অস্তিত্ব সংকটের কোনো সুস্পষ্ট সমাধান খুঁজে পায়নি। দেশের রাজনীতিতে বর্তমানে দলটির সমস্ত প্রকাশ্য কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা সেই নিষেধাজ্ঞার আদেশটি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও বহাল রেখেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলয় থেকে ছিটকে পড়ার পাশাপাশি দলটি তাদের দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত সাংগঠনিক শক্তি, রাজপথের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন—সবকিছুই হারিয়েছে। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও অস্তিত্ববিনাশী পরিস্থিতিতে দলটির তৃণমূল থেকে শুরু করে মধ্যম সারির অসংখ্য নেতা-কর্মীর মধ্যে এক তীব্র হতাশা এবং চরম দিকনির্দেশনাহীনতা বিরাজ করছে। রাজনীতিতে আবার কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তারা ফিরে আসতে পারে, তার কোনো রূপরেখা কারও কাছেই নেই। কারণ, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো তাদের অতীতের ভুলভ্রান্তি স্বীকার না করে পুরোনো এবং চরম অনমনীয় অবস্থানেই শক্ত হয়ে বসে আছেন।
বিগত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এবং পরে আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে একটি বিশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। প্রস্তাবটির মূল কথা ছিল দলটির অভ্যন্তরীণ ব্যাপক সংস্কার সাধন করা, যাকে রাজনৈতিক মহলে ‘পরিশুদ্ধ’ বা ক্লিন ইমেজের নতুন রাজনৈতিক ধারা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছিল। এই চিন্তাধারার মূল উদ্দেশ্য ছিল দলের ভেতরে থাকা চরম বিতর্কিত, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং গণ-অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নে অভিযুক্ত নেতাদের সরিয়ে দিয়ে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন, গ্রহণযোগ্য ও কম বিতর্কিত নেতাদের সামনে নিয়ে আসা। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এই পরিশুদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামোর ধারণাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন জাতীয় নাগরিক পার্টির এক শীর্ষ নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য। তখন গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবের হোসেন চৌধুরী কিংবা ফজলে নূর তাপসের মতো নেতাদের সামনে রেখে একটি নতুন রাজনৈতিক ছক কষার চেষ্টা চলছে প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের ইন্ধনে। গত এপ্রিলে নতুন সরকার সাবেক স্পিকারকে গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মাথায় তিনি জামিনে মুক্তি পেলে এই গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলে। কিন্তু দলটির দীর্ঘকালীন শীর্ষ নেত্রী, যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দলের একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন, তিনি এই সংস্কার বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারণাকে সমূলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি কোনোভাবেই দলের সভাপতির পদ ছাড়তে রাজি নন। সর্বোচ্চ ছাড় হিসেবে তিনি বিদেশে অবস্থানরত নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন কয়েকজন নেতাকে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা দেশি-বিদেশি কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীকেই ন্যূনতম সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, তা কার্যত অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে।
সংস্কারের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর দলের ভেতরে থাকা চরমপন্থী এবং কট্টরপন্থীদের একটি অংশ বর্তমানে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই অংশটি বিগত দেড় দশকের কোনো অপকর্ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা রাজনৈতিক ভুলের জন্য দেশবাসীর কাছে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশ করতে রাজি নয়। বরং তারা দেশের অভ্যন্তরে চোরাগোপ্তা হামলা, ঝটিকা মিছিল এবং বিচ্ছিন্নভাবে উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে দেশে একটি কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে থাকা তাদের পুরোনো সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি নীরব অসহযোগিতা ও সরকারবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া। দলের নীতি নির্ধারণী সমস্ত সিদ্ধান্ত এখনো শীর্ষ নেত্রী এবং তাঁর পরিবারের গুটিকয়েক সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো পর্দার আড়াল থেকে পরিচালনা করছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের মতো নেতারা। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশের শহর কলকাতায় বসে বিগত সরকারের এক প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী প্রশাসনের ভেতরের সুবিধাভোগীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি মোহাম্মদ এ আরাফাত ও বিপ্লব বড়ুয়ার মতো নেতারা বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে পত্রবিনিময় ও লবিংয়ের মতো কাজগুলো দেখভাল করছেন। কিন্তু যারা দলটির ভেতরে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং নতুন করে শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণে তারা এখন সম্পূর্ণভাবে নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন।
নির্বাসিত জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং আইনি জটিলতা দলটির নেতাদের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ভীতির সঞ্চার করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর দলের শীর্ষ নেত্রী বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের দেশে ফিরে গিয়ে আইনি লড়াই করার এবং প্রয়োজনে কারাবরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন নেতাও সেই আত্মঘাতী নির্দেশ পালনে সাড়া দেননি। কারণ, বর্তমান রাজনৈতিক ও বিচারিক বাস্তবতায় দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে যে সহজে জামিন মিলবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমনকি বর্তমান সরকার তাদের প্রতি কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখাবে, এমন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবেশও তৈরি হয়নি। দেশে থাকা নেতাদের একটি বড় অংশ বর্তমানে কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন, আর যারা বাইরে আছেন তারা প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তারের আতঙ্কে দিন পার করছেন। বিদেশে পালিয়ে থাকা নেতাদের জীবনও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। দিল্লি, কলকাতা, লন্ডন থেকে শুরু করে দুবাই বা কুয়ালালামপুর—যেখানেই তারা অবস্থান করছেন, সবার মাঝেই এক ধরনের অজানা আতঙ্ক ও দীর্ঘশ্বাস কাজ করছে। অনেকেই আর্থিক সংকটে ভুগছেন, আবার অনেকেই ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন। এমনকি দীর্ঘ সময় ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা অনেক প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্য এখন সেখান থেকেও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মালয়েশিয়া বা সাইপ্রাসের মতো দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের ভেতরে এই ভয় কাজ করছে যে, বর্তমান সরকারের সাথে যদি দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উষ্ণ হয়, তবে ভারতের মাটিতেও তারা আর নিরাপদ থাকবেন না।
নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বুক বেঁধেছিলেন যে হয়তো এবার তাদের ওপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং নেতারা ধীরে ধীরে জামিনে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন। কিন্তু গত তিন মাসের রাজনৈতিক চিত্র তাদের সেই আশায় পুরোপুরি জল ঢেলে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মতো পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা নিজেদের মনোবল চাঙ্গা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও তাদের সমর্থিত আইনজীবীদের মনোনয়নপত্র সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও তাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক স্পেস দেওয়া হবে না বলেই সবাই মনে করছেন। বাস্তবতার নিরিখে বর্তমান সরকার কোনোভাবেই এমন কোনো রাজনৈতিক ঝুঁকি নেবে না, যার ফলে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আবার মাঠে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে দলটির নেতারা এখন এক অদ্ভুত ‘অপেক্ষার রাজনীতি’ শুরু করেছেন। তাদের আশা, ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব নিয়ে হয়তো খুব শিগগিরই ক্ষমতাসীন সরকার এবং তাদের প্রধান বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের মধ্যে একটি চরম সংঘাত তৈরি হবে। আর সেই সুযোগে তারা পুনরায় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাবেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদের এই ভাবনা পুরোপুরি অবাস্তব। কারণ, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তারা জামায়াতকে ঠেকাতে কৌশলগতভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নীরব সমর্থন দিলেও, এই দুই শক্তির মধ্যে ফাটল ধরার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ এখনো নেই।
দেশের প্রথিতযশা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকরা মনে করেন, এই দলটির সামনে রাজনীতিতে ফিরে আসার সহজ কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। রাজনীতিতে যদি তাদের আবার জায়গা পেতে হয়, তবে সর্বপ্রথম তাদের বিগত সাড়ে পনেরো বছরের ভয়াবহ দুঃশাসন, দুর্নীতি, গুম-খুন এবং ভোটাধিকার হরণের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে নিঃশর্ত ও প্রকাশ্য ক্ষমা চাইতে হবে। একই সাথে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দমাতে গিয়ে তারা যে মানবতাবিরোধী ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত করেছে, তার আইনি বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার মতো সৎ সাহস দেখাতে হবে। কিন্তু দলটির বর্তমান চালচিত্র প্রমাণ করে যে, তারা এসবের কোনো কিছুর জন্যই মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তারা যদি জনসমর্থন ছাড়া কেবল বিদেশি শক্তির ইন্ধনে বা গায়ের জোরে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করে, তবে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের প্রতিহত করবে। তবে অনেক গবেষক এটিও মনে করেন যে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রাখাটা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে ভুল করেছিল, বর্তমান সরকারও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে। নেপালের মতো দেশগুলোতে গণ-অভ্যুত্থানের পর কোনো দলকে নিষিদ্ধ না করে তাদের নির্বাচনের মাঠে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। বাংলাদেশেও সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের বিচার হওয়া উচিত ছিল। উল্টো নিষিদ্ধ করে রাখার ফলে দলটি এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে প্রচার করার এক অন্যায্য সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায়, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব, শীর্ষ নেতৃত্বের চরম অহমিকা এবং জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা না থাকায় দলটির অগণিত কর্মী-সমর্থক আজ এক ঘোর অন্ধকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো