বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল দশক পার করার পর অবশেষে নিজেদের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর জাতীয় সম্মেলন বা কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও, গত দশ বছরে নানামুখী রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আইনি জটিলতা এবং বৈশ্বিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যখন দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত, তখন দলকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর একটি তাগিদ দলের ভেতরে-বাইরে প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর এবার দলের কাঠামোতে বড় ধরনের রদবদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি বিশেষ বৈঠকের পর দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই কাউন্সিলের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে দেশজুড়ে দল গোছানোর পাশাপাশি বর্ধিত সভাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা কাউন্সিলেরই প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত।
আসন্ন এই কাউন্সিলে বিএনপির শীর্ষ পদ অর্থাৎ চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, দলটির বর্তমান কাঠামোর মধ্যে তারেক রহমান একজন অবিসংবাদিত ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এর একটি বড় ঐতিহাসিক ও আবেগীয় প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০১৮ সালে দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী প্রায় আট বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেছেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে আনে। এই বিশাল শূন্যতা পূরণে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির এক জরুরি বৈঠকে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত পদ থেকে ভারমুক্ত করে দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এর আগে ২০১৬ সালের কাউন্সিলেও যেমন বেগম খালেদা জিয়ার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না, তেমনি এবারের কাউন্সিলে তারেক রহমানের বিপক্ষেও কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে চেয়ারম্যানের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদটি হলো মহাসচিব। বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দলের এই কঠিনতম দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এমনকি পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়ার আগে কয়েক বছর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবেও দলের হাল ধরেছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। বয়সের ভার এবং দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের কারণে তিনি শারীরিকভাবে বেশ ক্লান্ত। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তার অবসরের ইচ্ছার কথা খোলামেলাভাবেই প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে, আসন্ন কাউন্সিল পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে চান এবং এরপর বয়সের কারণে অবসর নিতে আগ্রহী। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই মহাসচিব পদে কে আসছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুমুল জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে।
দলের একটি বড় অংশ মনে করে, মির্জা ফখরুল দলের সবচেয়ে দুর্দিনে যে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তার বিকল্প পাওয়া কঠিন। তবে তিনি যদি একান্তই সরে দাঁড়ান, তবে এই শূন্যস্থান পূরণে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার নাম জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে হাইকমান্ডের অন্যতম আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। এরপরই আলোচনায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত মুখ এবং দলের আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে তার সক্রিয় ভূমিকা তাকে এই পদের জন্য একজন যোগ্য প্রার্থী করে তুলেছে। এছাড়া, তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সামলানোর অপরিসীম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর নামও এই দৌড়ে বেশ শক্তভাবে রয়েছে। পাশাপাশি, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসার কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুমুল জনপ্রিয় যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিও হাইকমান্ডের গুডবুকে রয়েছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হলো জাতীয় স্থায়ী কমিটি। ২০১৬ সালের কাউন্সিলের সময় এই কমিটিতে ১৯টি পদ রাখা হলেও মৃত্যু, অসুস্থতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের কারণে বর্তমানে বেশ কয়েকটি পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই ফোরামে ১৬ জন সদস্য থাকলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি অনেক বদলে যায়। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করায় শূন্যস্থান আরও বাড়ে। বর্তমানে এই কমিটিতে পদাধিকার বলে রয়েছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমানসহ আরও বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতা এই কমিটিতে রয়েছেন। তবে বয়স এবং অসুস্থতাজনিত কারণে অনেকেই এখন আগের মতো সক্রিয় থাকতে পারছেন না। বিশেষ করে বর্ষীয়ান নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী এবং মির্জা আব্বাস গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত রমজান থেকে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে বেশ কয়েকজন নতুন ও পরীক্ষিত নেতাকে যুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিগত দিনে রাজপথের আন্দোলনে যাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য এবং যারা দলের চরম দুঃসময়ে হাল ছাড়েননি, তাদেরকেই এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর নাম। এছাড়া যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামও জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে যারা সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছিলেন এবং দলের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত অর্জনকে বিসর্জন দিয়েছিলেন, আসন্ন কাউন্সিলে দল তাদের সেই ত্যাগের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই কাউন্সিলে বিএনপি একটি যুগান্তকারী রূপরেখা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, যেখানে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং নবীনদের উদ্যমের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটবে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও এমনটাই আভাস দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, দলের শীর্ষ পদে পরিবর্তন না এলেও, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন স্থায়ী কমিটি, যুগ্ম মহাসচিব ও ভাইস চেয়ারম্যানের মতো জায়গাগুলোতে তরুণ নেতৃত্বকে ব্যাপকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি একটি বিশাল রাজনৈতিক দলকে সুসংগঠিত রাখতে নতুন প্রজন্মের শক্তির কোনো বিকল্প নেই। তবে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সততা, দেশপ্রেম, দলের আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা এবং পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে সর্বোচ্চ মাপকাঠি হিসেবে ধরা হবে। দলের যারা বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের ওপর থেকে সাংগঠনিক চাপ কমিয়ে নতুন নেতাদের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দেওয়ার একটি পরিকল্পনাও দলের ভেতরে চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তারা মোট ছয়টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ১৯৭৮ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮২ সালে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এবং ১৯৮৪ সালের পর থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮৮, ১৯৯৩, ২০০৯ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে আগামী সপ্তম কাউন্সিলটি বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি সম্মেলন হতে যাচ্ছে। একদিকে এক দশকের জমে থাকা সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটানো, অন্যদিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা—এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি বড় পরীক্ষা হবে এই কাউন্সিল। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এই কাউন্সিলের মাধ্যমে এমন একটি নেতৃত্ব উঠে আসবে, যারা দলকে আগামী দিনের আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রধান নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করবে।
দধ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন