শিরোনামঃ
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জীবনাবসান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর পদত্যাগ প্যারেন্ট- টিচার মিটিং : যা জিজ্ঞেস করা জরুরি রামিসা হত্যা: আদালতে তৃতীয় ব্যক্তি ‘ডলার’কে দুষলেন সোহেল ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ছাড়ছে হাজারো মানুষ স্থানীয় নির্বাচনে নিষিদ্ধ দলের অংশগ্রহণ ঠেকাতে ইসির খসড়া জঙ্গল সলিমপুরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এগারো বাহিনীর রামরাজত্ব এক দশক পর বিএনপির কাউন্সিলে আসছে নতুন নেতৃত্ব সাগরতলের নিরাপত্তা রক্ষায় চালকবিহীন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বানাচ্ছে আকুস কুমিল্লায় এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের অভিযোগ
সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন

জঙ্গল সলিমপুরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এগারো বাহিনীর রামরাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের কোল ঘেঁষে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এর ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে পাহাড়ে ঢুকে যাওয়া সরু পথটি যেন এক অন্য জগতের প্রবেশদ্বার। এই পথ ধরে জঙ্গল সলিমপুরের গহিনে প্রবেশ করলে পাহাড় কাটার দগদগে ক্ষত আর সারি সারি টিনের চালার নিচে বসবাসকারী হাজারো মানুষের বোবা কান্না স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রায় চার দশক ধরে সীতাকুণ্ড ও বায়েজিদ সংলগ্ন ৩ হাজার ১০০ একরের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বীরদর্পে চলছে সরকারি খাসজমি দখল ও ত্রাসের রাজত্ব। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এখানকার পাহাড় কাটা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। সরকার বদলায়, ক্ষমতার হাতবদল হয়, কিন্তু রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ১১টি সশস্ত্র বাহিনীর কাছে জিম্মি থাকা ৩০ হাজার পরিবারের ভাগ্য বদলায় না। সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা এই অভয়াশ্রম ও সন্ত্রাসীদের আস্তানা যেকোনো মূল্যে নির্মূল করা হবে।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে ভূমিহীন ও ছিন্নমূল মানুষকে পুনর্বাসনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে এখানকার পাহাড় দখলের সূচনা হয়। সময়ের পরিক্রমায় নিরীহ সেই আন্দোলন একটি সুসংগঠিত ও ভয়ংকর ভূমি দখলকারী সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই এলাকায় নাইট সাফারি পার্ক, কেন্দ্রীয় কারাগার কিংবা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর প্রবল প্রতিরোধ এবং আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও দুর্গম পাহাড়ি পথ ও গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে গডফাদাররা সহজেই পার পেয়ে যায়। স্থানীয়দের মতে, এই চক্র ভাঙতে না পারার মূল কারণ হলো এর পেছনে থাকা শতকোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ, যার সঙ্গে প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরাসরি জড়িত।

বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরের বিশাল এলাকাটিকে ১১টি ব্লকে ভাগ করে মূলত তিনটি প্রধান কাগুজে সংগঠনের আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি’র আড়ালে আলীনগর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আশীর্বাদপুষ্ট এই ইয়াসিন বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নতুন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অঘোষিত সম্রাট হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল (সমন্বয়) সংগ্রাম পরিষদ’-এর মাধ্যমে ছিন্নমূল এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী কাজী মশিউর রহমান ও তার অনুসারী রিদুয়ান, যাদের একসময় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি দিদারুল আলম ও এস এম আল মামুনের মদদ ছিল। এছাড়া ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি’র নিয়ন্ত্রক রোকন উদ্দিন মেম্বারকে আশ্রয় দিচ্ছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতা। এই তিন প্রধান বাহিনী ছাড়াও পাহাড়ের গহিনে লাল বাদশা, ফারুক, গফুর মেম্বার, গাজী সাদেক বাহিনীসহ মোট ১১টি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যারা ১৫ থেকে ২২ সদস্যের উপ-গ্রুপের মাধ্যমে পুরো এলাকায় রাজত্ব করছে।

জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি খাসজমি ও বনভূমি দখল করে শত শত কোটি টাকার যে অবৈধ বাণিজ্য চলছে, তা রীতিমতো শিহরণ জাগানো। প্রকাশ্য দিবালোকে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে সমতল করে দুই থেকে পাঁচ শতকের প্লট তৈরি করা হচ্ছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষ ও পলাতক আসামিদের কাছে ২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। কোনো বৈধ দলিল ছাড়াই কেবল ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ভুয়া চুক্তির মাধ্যমে এই লেনদেন চলে, যেখানে সমিতিকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহের নামে গড়ে তোলা হয়েছে এক ভয়ংকর ‘সেবা খাত’ সিন্ডিকেট। মাত্র ২২টি মিটারের অধীনে অবৈধভাবে পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংযোগ ফি বাবদ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং প্রতি ইউনিটে ১৮ থেকে ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। পানির নতুন সংযোগের জন্য ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা এবং মাসিক বিল হিসেবে ৬০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য হচ্ছেন বাসিন্দারা। এমনকি বাধ্য হয়ে সিন্ডিকেটের কাছ থেকেই চড়া দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হয় তাদের। রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠা এই আরেক ‘অঘোষিত রাষ্ট্রের’ মাসিক চাঁদা আদায়ের পরিমাণ অন্তত আট থেকে দশ কোটি টাকা, যা পাহাড়ের এই কান্নাকে প্রলম্বিত করে চলেছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...