শিরোনামঃ
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জীবনাবসান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর পদত্যাগ প্যারেন্ট- টিচার মিটিং : যা জিজ্ঞেস করা জরুরি রামিসা হত্যা: আদালতে তৃতীয় ব্যক্তি ‘ডলার’কে দুষলেন সোহেল ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ছাড়ছে হাজারো মানুষ স্থানীয় নির্বাচনে নিষিদ্ধ দলের অংশগ্রহণ ঠেকাতে ইসির খসড়া জঙ্গল সলিমপুরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এগারো বাহিনীর রামরাজত্ব এক দশক পর বিএনপির কাউন্সিলে আসছে নতুন নেতৃত্ব সাগরতলের নিরাপত্তা রক্ষায় চালকবিহীন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বানাচ্ছে আকুস কুমিল্লায় এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের অভিযোগ
সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:২৩ অপরাহ্ন

সাগরতলের নিরাপত্তা রক্ষায় চালকবিহীন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বানাচ্ছে আকুস

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এখন কেবল স্থলভাগ বা আকাশসীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে সমুদ্রের গভীর তলদেশে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় এবার একজোট হয়ে কাজ করার যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোট ‘আকুস’। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ শীর্ষক নিরাপত্তা সম্মেলনে দেশ তিনটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা যৌথভাবে জানিয়েছেন যে, তারা সমুদ্রতলের অবকাঠামো সুরক্ষায় অত্যাধুনিক এবং চালকবিহীন আন্ডারওয়াটার ড্রোন বা ইউইউভি (আনম্যানড আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল) তৈরির বিশেষ প্রকল্পে হাত দিয়েছেন। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এই মানববিহীন জলযানগুলোর প্রযুক্তি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। মূলত বৈশ্বিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত সাবমেরিন কেবলগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

এই উচ্চাভিলাষী ড্রোন প্রকল্পের সর্বমোট ব্যয়ের পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও, যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি নিশ্চিত করেছেন যে তার দেশ এতে অন্তত ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ২০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবদান রাখবে। বিগত কয়েক বছর ধরে আকুস জোটের বিভিন্ন চুক্তির বাস্তবায়ন ও ধীরগতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সমালোচনা চলছিল। জন হিলি অত্যন্ত অকপটে সেই সমালোচনার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, অতীতে আকুস চুক্তির অধীনে কাজের চেয়ে কথাবার্তা বেশি হয়েছে, কিন্তু বর্তমান তিন সরকারের অধীনে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে এবং তারা এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহের দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

২০২১ সালে যখন প্রথম আকুস জোট আত্মপ্রকাশ করে, তখন এর প্রধান লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন তৈরিতে সার্বিক সহায়তা করা। তবে বর্তমানের এই আন্ডারওয়াটার ড্রোন প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে এই জোটের ‘পিলার টু’ বা দ্বিতীয় স্তম্ভের অধীনে। এই দ্বিতীয় স্তম্ভের মূল উদ্দেশ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান করা, যার মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার হাইপারসনিক মিসাইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং সমুদ্রগর্ভের রোবোটিক্স। নতুন তৈরি হতে যাওয়া এই ড্রোনগুলো কেবল নজরদারির কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এগুলোতে সংযুক্ত থাকবে অত্যাধুনিক সেন্সর, সমরাস্ত্র এবং পেলোড ব্যবস্থা। এর ফলে এগুলো সমুদ্রের তলদেশে লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা, শত্রুর ওপর হামলা এবং আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রার সূচনা করবে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

আধুনিক বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন—সবকিছুই বহুলাংশে নির্ভরশীল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কের ওপর। যেকোনো অন্তর্ঘাতমূলক কারণে এই কেবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আকুসের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের নতুন ইউইউভি প্রযুক্তি এমনভাবে নকশা করা হচ্ছে যা সমুদ্রতলের এসব গুরুত্বপূর্ণ কেবল এবং পাইপলাইনের ওপর আসা হুমকিগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও প্রতিহত করতে সক্ষম হবে। প্যাসিফিক মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর এবং হাই নর্থ বা উত্তরমেরু সংলগ্ন জলসীমায় সম্ভাব্য যেকোনো অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা রুখে দিতে এই ড্রোনগুলো অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করবে।

সমুদ্রের তলদেশের এই আধুনিক স্নায়ুযুদ্ধের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে রাশিয়া এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক তৎপরতা। কিছুদিন আগেই যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন যে, ব্রিটিশ জলসীমার উত্তরাংশে সাবমেরিন কেবল এবং গ্যাস পাইপলাইনগুলোর আশেপাশে রাশিয়া অত্যন্ত গোপনে সন্দেহজনক অভিযান পরিচালনা করছে। যদিও মস্কো বরাবরের মতোই এই ধরনের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে, তবে পরিসংখ্যান বলছে গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যের জলসীমায় রুশ নৌবাহিনীর জাহাজের উপস্থিতি প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান হুমকির কারণেই গত ডিসেম্বরে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে রাশিয়ার সাবমেরিনগুলোর গতিবিধি শনাক্ত করতে নরওয়ের সাথে একটি বিশেষ সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল যুক্তরাজ্য। বিশ্বের অন্তত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন কেবলের সাথে যুক্তরাজ্যের সরাসরি সংযোগ রয়েছে, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

অন্যদিকে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এবং বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিও আকুস জোটের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানের আশেপাশের জলসীমায় এবং এমনকি ইউরোপের সুইডিশ ভূখণ্ডের কাছাকাছি বাল্টিক সাগরেও সমুদ্রগর্ভের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমা সামরিক পর্যবেক্ষকদের সন্দেহ, এসব ঘটনার পেছনে চীনা নৌবাহিনীর গোপন জাহাজ বা সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। যদিও সিঙ্গাপুরের সম্মেলনে তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সরাসরি রাশিয়া বা চীনের নাম উল্লেখ করে এই সমরাস্ত্র প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এবং মস্কোর ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী নৌ-তৎপরতা মোকাবিলার জন্যই মূলত আকুসের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ।

প্রতিরক্ষা জোটটির প্রথম স্তম্ভ বা ‘পিলার ওয়ান’-এর মূল আকর্ষণ হলো অস্ট্রেলিয়ার জন্য পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন তৈরি করা। সামরিক দিক থেকে এটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। যুক্তরাজ্যের পর অস্ট্রেলিয়াই হতে যাচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় কোনো দেশ, যারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ পারমাণবিক প্রোপালশন বা চালিকাশক্তি সংক্রান্ত প্রযুক্তি পেতে যাচ্ছে। তবে এত বিশাল একটি প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ ২০৪০-এর দশকের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই ক্রমশ সংশয় ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পুরনো সাবমেরিনগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় মাঝখানের এই সময়টিতে দেশটির নৌ-নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতা পূরণের জন্য একটি বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ২০৩০-এর দশকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কয়েকটি পুরনো বা সেকেন্ড-হ্যান্ড পারমাণবিক সাবমেরিন ক্রয় করবে। তার আগে, এই দশকের শেষভাগ থেকেই মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিদ্যমান সাবমেরিনগুলো অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন নৌঘাঁটিতে নিয়মিতভাবে আবর্তন শুরু করবে। সিঙ্গাপুর সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিশ্চিত করেছেন যে, এই পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ সঠিক পথেই এগোচ্ছে এবং চলতি বছরের শেষদিকেই মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম একটি চৌকস দল অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছাবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লসও তার দেশের এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী মনোভাব পোষণ করেছেন। তিনি সমালোচকদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আকুসের এই সাবমেরিন প্রকল্পের কোনো বিকল্প বা “প্ল্যান বি” তাদের হাতে নেই, তাই যেকোনো মূল্যেই হোক এটিকে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি আরও জানান, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এইচএমএএস স্টার্লিং নৌঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাবমেরিন বহর গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে। পাশাপাশি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় একটি বিশাল নির্মাণ ইয়ার্ড তৈরির কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে, যেখানে ভবিষ্যতে আকুসের নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোর মূল কাঠামো নির্মাণ করা হবে।

অত্যাধুনিক এই সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতার একটি বড় দিক হলো সামরিক প্রযুক্তির নিখুঁত প্রয়োগ। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে সমুদ্রের তলদেশে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের চেয়ে স্বয়ংক্রিয় ড্রোনগুলোর ভূমিকাই প্রধান হয়ে উঠবে। আকুসের নির্মিত এই ইউইউভিগুলো একটানা দীর্ঘ সময় সমুদ্রের তলদেশে নিঃশব্দে অবস্থান করতে পারবে এবং শত্রুপক্ষের যেকোনো সংকেত বা গতিবিধি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে কমান্ড সেন্টারে তথ্য পাঠাতে সক্ষম হবে। মানববিহীন হওয়ায় এগুলোর আকার হবে অনেক ছোট এবং রাডারে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা হবে তুলনামূলক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার এই ত্রিদেশীয় জোট যদি তাদের ঘোষণামতো আগামী বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।


এ জাতীয় আরো খবর...