শিরোনামঃ
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জীবনাবসান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর পদত্যাগ প্যারেন্ট- টিচার মিটিং : যা জিজ্ঞেস করা জরুরি রামিসা হত্যা: আদালতে তৃতীয় ব্যক্তি ‘ডলার’কে দুষলেন সোহেল ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ছাড়ছে হাজারো মানুষ স্থানীয় নির্বাচনে নিষিদ্ধ দলের অংশগ্রহণ ঠেকাতে ইসির খসড়া জঙ্গল সলিমপুরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এগারো বাহিনীর রামরাজত্ব এক দশক পর বিএনপির কাউন্সিলে আসছে নতুন নেতৃত্ব সাগরতলের নিরাপত্তা রক্ষায় চালকবিহীন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বানাচ্ছে আকুস কুমিল্লায় এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের অভিযোগ
সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন

স্ত্রী-সন্তানের লাশ কাঁধে অসহায় স্বামী, ভিডিওতে মত্ত জনতা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

ঈদের আনন্দঘন মুহূর্ত যে একটি পরিবারের জন্য এমন ভয়াবহ বিভীষিকায় রূপ নিতে পারে, তা হয়তো সুজন মিয়া কখনো কল্পনাও করেননি। নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবারেরই স্বপ্ন চূর্ণ করেনি, বরং আধুনিক সমাজের মানুষের চরম নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিকতার চরম শূন্যতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। ঈদের কেনাকাটা শেষে স্ত্রী সাথী বেগম ও দেড় বছরের শিশুপুত্র সাফওয়ানকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন সুজন। রেললাইন পার হওয়ার সময় আচমকা দ্রুতগতির আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তাঁর স্ত্রী ও বুকের ধন। এক হাতে বেঁচে যাওয়া শিশুকন্যা ও শপিং ব্যাগ, আর অন্য হাতে স্ত্রী-পুত্রের নিথর দেহ নিয়ে এক অসহায় পিতার আর্তনাদ সেদিন স্টেশনের বাতাস ভারী করে তুললেও, উপস্থিত শত শত মানুষের হৃদয় গলাতে পারেনি।

সুজন মিয়ার জীবনের সবচেয়ে ভারী এবং মর্মান্তিক সেই মুহূর্তটিতে সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের এক ভয়ংকর দিক ফুটে উঠেছে, যাকে আধুনিক বিশ্বে ‘ডিজিটাল অ্যাপ্যাথি’ বা ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’ বলা হয়। বিশ্বজুড়েই বর্তমানে দুর্ঘটনার শিকার মানুষকে সাহায্য করার বদলে স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণ করার এক বিকৃত মানসিকতা মহামারি আকার ধারণ করেছে। নরসিংদীর এই ঘটনাটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। দুর্ঘটনার পর রক্তাক্ত স্ত্রী ও সন্তানের লাশ যখন সুজন নিজের কাঁধ ও বুকে তুলে নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটছিলেন, তখন চারপাশে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ তাঁকে ন্যূনতম সাহায্যটুকু করেনি। বরং তাদের অধিকাংশের হাতেই ছিল স্মার্টফোন, যারা এই অবর্ণনীয় শোকের দৃশ্যটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টিকটকের জন্য ক্যামেরাবন্দি করতে বেশি ব্যস্ত ছিল। উন্নত বিশ্বেও আজকাল সড়ক বা রেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এই ধরনের অমানবিক আচরণের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে, যেখানে বিপন্ন মানুষের জীবনের চেয়ে একটি ভাইরাল ভিডিওর মূল্য বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুজন মিয়া জানান, তিনি একজন নিতান্তই গরিব মানুষ, যার সম্বল ছিল কেবল এই ছোট্ট পরিবারটি। স্ত্রী-সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে তাঁর মনে হচ্ছিল তিনি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু বহন করছেন। যেখানে নতুন জামাকাপড় নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেখানে তাঁকে ফিরতে হলো প্রিয়জনদের নিথর দেহ নিয়ে। মা হারা ছোট্ট মেয়েটির আর্তনাদ তাঁকে আরও বেশি নিঃস্ব করে দিয়েছে। ঘটনাটি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। নেটিজেনরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রশ্ন তুলেছেন, একজন লোক যখন দুটি লাশ নিয়ে দিশেহারা, তখন একজন মানুষেরও কি মানবিকতা জাগ্রত হয়নি যে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে? মানুষের এই বিকৃত মানসিকতা সমাজের পচনশীল রূপটিকেই অত্যন্ত করুণভাবে তুলে ধরেছে।

দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনার পরপর সেখানে কোনো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে দেখা যায়নি। নরসিংদী রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ দিলীপ কুমার জানান, তাঁরা খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলেও গিয়ে দেখেন লাশগুলো ততক্ষণে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে, ঈদের ছুটির কারণে বিষয়টি সম্পর্কে শুরুতে অবগত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। তবে তিনি দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে ওই অসহায় পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রশাসনের এই সহায়তা সুজন মিয়ার বুকভরা শূন্যতা মেটাতে না পারলেও, সেদিন স্টেশনে উপস্থিত জনতার অমানবিকতার যে কলঙ্কজনক ইতিহাস রচিত হলো, তা সভ্য সমাজের জন্য এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই থাকবে।

তথ্যসূত্র: আজকের কাগজ


এ জাতীয় আরো খবর...