লিফটে পা রাখার পরপরই আমাদের চোখ অবচেতনভাবেই দেয়ালে থাকা আয়নাটার দিকে চলে যায়। কেউ চুল বা পোশাকটা একটু গুছিয়ে নেন, কেউ আবার স্রেফ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড পার করে দেন। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে মানুষের সাধারণ অভ্যাস বা আত্মমুগ্ধতা মনে হলেও, মনোবিজ্ঞান এবং লিফটের নকশার পেছনে রয়েছে দারুণ কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আচরণের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:
মনোবিজ্ঞানে ‘সেলফ-অ্যাওয়ারনেস’ বা আত্মসচেতনতার একটি গভীর ধারণা রয়েছে। মানুষ যখনই তার সামনে কোনো আয়না বা প্রতিচ্ছবি eclipse বা দেখে, তখন সে নিজের বাহ্যিক উপস্থিতি সম্পর্কে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে লিফটে ঢুকে আয়না দেখার সাথে সাথেই মন অবচেতনভাবে হিসাব মেলাতে শুরু করে—সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো? মানুষের দৃষ্টি সহজাতভাবেই নিজের মুখের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, তাই এটি একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায় অন্যেরা তাকে কীভাবে দেখছে বা মূল্যায়ন করছে, তা নিয়ে সবসময়ই সচেতন থাকে। অফিস, শপিং মল বা বহুতল ভবনের লিফট হলো এমন এক জায়গা যেখানে হঠাৎ করেই চেনা-অজানা মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। তাই অন্যদের সামনে নিজেকে পরিপাটি ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার একটি সামাজিক তাগিদ থেকেই মানুষ আয়নায় নিজেকে দ্রুত একবার পরখ করে নেয়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, লিফটে আয়না বসানোর আসল উদ্দেশ্য কিন্তু মানুষের রূপচর্চা বা চেহারা দেখা নয়। স্থাপত্য ও নকশাবিদদের মতে, লিফটের মতো ছোট্ট ও চারপাশ বন্ধ বক্সের ভেতর আয়না থাকলে সেটি এক ধরনের দৃষ্টিভ্রম তৈরি করে জায়গাটিকে তুলনামূলক বড় এবং খোলামেলা দেখায়। এর ফলে যাঁদের বদ্ধ জায়গায় ভয় বা ‘ক্লস্ট্রোফোবিয়া’ রয়েছে, তাঁদের অস্বস্তি অনেকটাই কমে আসে। এছাড়া আয়নায় মনোযোগ ধরে রাখলে লিফটের ভেতরের একঘেয়ে অপেক্ষার সময়টুকুও অনেক দ্রুত কেটে যায় বলে মনে হয়।
তবে সবাই যে একই উদ্দেশ্যে তাকায় তা নয়; কেউ সময় কাটাতে, কেউ চেহারা দেখতে, আবার কেউ লিফটের ভিড়ে নিজের চারপাশের পরিস্থিতি ও মানুষের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতেও আয়নার সাহায্য নেন। তাই পরবর্তী সময়ে লিফটে ঢুকে আয়নায় চোখ চলে গেলে নিজেকে নিয়ে লজ্জিত বা অবাক হওয়ার কিছু নেই, এটি মানুষের অতি স্বাভাবিক এক মনস্তাত্ত্বিক আচরণ।