মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে (আরাকান) সামরিক জান্তা সরকারের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন চূড়ান্ত পতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) রাজ্যটি থেকে জান্তা বাহিনীকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করতে এক সর্বাত্মক ও চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরু করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা পুরো রাখাইন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। ইতোমধ্যে রাখাইনের মোট ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি এবং পার্শ্ববর্তী চীন রাজ্যের পালেতওয়া অঞ্চলটি আরাকান আর্মির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বর্তমানে জান্তা বাহিনীর শেষ শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বাকি তিনটি টাউনশিপ—সিত্তওয়ে, কিয়াকফিউ এবং মানাউং চারদিক থেকে অবরুদ্ধ। বিশেষ করে রাখাইনের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সিত্তওয়ে এবং চীনের শতকোটি ডলারের মেগাপ্রজেক্ট সমৃদ্ধ কৌশলগত অঞ্চল কিয়াকফিউতে অবস্থিত মিয়ানমার নৌবাহিনীর প্রধান পশ্চিমাঞ্চলীয় ঘাঁটিগুলোকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলেছে এএ যোদ্ধারা। স্থলযুদ্ধ, নৌযুদ্ধ, উপর্যুপরি বিমান হামলা এবং তীব্র গোলন্দাজ লড়াইয়ের কারণে পুরো অঞ্চলে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাখাইনে জান্তা শাসনের অবসান এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
প্রধান প্রশাসনিক রাজধানী সিত্তওয়ে শহরটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত দুই বছর ধরে মিয়ানমার সামরিক জান্তা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল। শহরজুড়ে অসংখ্য বাঙ্কার নির্মাণ, চারদিকে ল্যান্ডমাইন স্থাপন এবং নতুন নতুন সামরিক ফাঁড়ি তৈরি করলেও তারা আরাকান আর্মির তীব্র অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই রুখতে পারছে না। বর্তমানে সিত্তওয়েকে স্থলপথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে জান্তা বাহিনী এখন কেবল বঙ্গোপসাগর ও নদীপথ ব্যবহার করে নৌপথে তাদের রসদ ও গোলাবারুদ আনা-নেওয়া করছে। আর এই নৌরুটটি বন্ধ করতে এএ যোদ্ধারা নদী ও সাগরে তীব্র গোলন্দাজ ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে। বঙ্গোপসাগর এবং কালাদান নদীর অববাহিকায় অবস্থান নেওয়া জান্তা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং আরাকান আর্মির গোলন্দাজ বাহিনীর মধ্যে গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অবিরাম গোলাগুলি চলছে। সিত্তওয়ের দক্ষিণ-পূর্বে এবং পন্নাগ্যুন টাউনশিপের সীমান্তের কাছে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘শোয়ে মিন গান’ নৌ-সহায়তা ঘাঁটি এবং সিত্তওয়ের আঞ্চলিক অপারেশন কমান্ডের ঠিক উত্তরে অবস্থিত ‘ক্যার মা থাউক’ সামরিক ঘাঁটিতে চারদিক থেকে আক্রমণ জোরদার করেছে আরাকান আর্মি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, গভীর রাতে অনবরত কামানের গোলার শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। যখন জান্তার যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে আসে, তখন পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত হলেও বিমান চলে যাওয়া মাত্রই আবার দ্বিগুণ শক্তিতে স্থল আক্রমণ শুরু হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সাম্প্রতিক এক সফল গোলন্দাজ হামলায় জান্তা বাহিনীর অন্তত একটি বড় যুদ্ধযান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে মিয়ানমার নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো এখন কালাদান নদীতে প্রবেশ করতে চরম ভয় পাচ্ছে। তাদের কার্যক্রম এখন নদী থেকে সংকুচিত হয়ে উপকূল থেকে অনেক দূরে গভীর সমুদ্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং তারা সেখান থেকেই দূরপাল্লার শেলিং বা দূরবর্তী গোলাবর্ষণ চালাচ্ছে। অন্যদিকে সিত্তওয়ের ‘পি তা থা’ ওয়ার্ডের মতো বেসামরিক এলাকাগুলোর প্রবেশপথে বাঙ্কার ও ল্যান্ডমাইন বসিয়ে পুরো শহরকে একটি অবরুদ্ধ সামরিক দুর্গে পরিণত করেছে জান্তা, যাতে তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ হলো ভারতের অর্থায়নে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটের সংযোগ থেকে জান্তা সরকার চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, যা তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতাকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।
অন্যতম প্রধান ফ্রন্টলাইন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে কিয়াকফিউ অঞ্চলটি, যা অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানেই রয়েছে চীনের অর্থায়নে ও সমর্থনে বাস্তবায়নাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর, অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইন,ガス পাইপলাইন এবং মেইড আইল্যান্ডের বিশাল জ্বালানি টার্মিনাল। এই কৌশলগত রুটের মাধ্যমেই চীন মূলত ‘মালক্কা প্রণালী’ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করার পথ সুগম করেছে। এই অঞ্চলে জান্তার প্রধান সুরক্ষাকবচ হলো ‘টং মও ওও’ নৌঘাঁটি, যা দান্যবতী বা দানিয়াওয়াড্ডি নৌসদর দফতরের অধীনে পরিচালিত হয়। সম্প্রতি এই ঘাঁটি থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে ‘সানে’ নামক শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় জান্তা সেনাদের ওপর এক মারাত্মক অ্যাম্বুশ বা ওঁৎপেতে হামলা চালায় আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। গত ২৯ মে থেকে ১ জুনের মধ্যে চলা এই রক্তক্ষয়ী ও তীব্র সংঘর্ষে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একজন弹性 ক্যাপ্টেনসহ অন্তত ৪০ জনেরও বেশি সৈন্য নিহত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আরাকান আর্মি ২০টিরও বেশি লাশ এবং বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। এই চরম বিপর্যয়ের পর জান্তা বাহিনী তাদের সম্মুখ প্রতিরক্ষা লাইন হারিয়ে পুরোপুরি পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ‘টং মও ওও’ নৌঘাঁটির মূল সীমানার ভেতরে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে ওই ঘাঁটিতে ১১তম লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন এবং দানিয়াওয়াড্ডি নৌসদর দফতরের অবশিষ্টাংশ সেনারা অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবার, নারী ও শিশুদের নৌপথে কিয়াকফিউ শহরের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ‘৩৪তম ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন’ থেকে নতুন সৈন্য ও রিইনফোর্সমেন্ট পাঠানো হচ্ছে। এই নৌঘাঁটিটি হাতছাড়া হলে জান্তা বঙ্গোপসাগরে তাদের একক সামরিক ও নৌ আধিপত্য সম্পূর্ণভাবে হারাবে।
স্থল ও নৌযুদ্ধে একের পর এক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এখন সম্পূর্ণরূপে তাদের বিমানবাহিনীর ওপর নির্ভর করে এক ধ্বংসাত্মক ‘পোড়া মাটি নীতি’ গ্রহণ করেছে। স্থলভাগের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল কৌশল ব্যবহার করছে। ত্রাণ সংস্থা ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টং মও ওও ঘাঁটির আশপাশের বেসামরিক গ্রামগুলোতে এবং কিয়াকফিউ ও তৌঙ্গুপ টাউনশিপের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে জান্তা বাহিনী ফাইটার জেট, ড্রোন এবং জাইরোকপ্টার ব্যবহার করে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে চলেছে। এমনকি ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াবাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষের অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরগুলোতেও জান্তা বাহিনী ‘ইনসেনডিয়ারি বোম’ বা বিশেষ অগ্নিসংযোগকারী বোমা ফেলছে। এর ফলে সানে শহরসহ আশপাশের শত শত ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পুড়ে সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে। জান্তা বাহিনী এখন বড় ফাইটার জেটের পাশাপাশি জাইরোকপ্টারের মতো ছোট ও হালকা কপ্টার ব্যবহার করছে, যা নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা সাধারণ মানুষ এবং এএ-র অগ্রবর্তী দলগুলোর ওপর নিখুঁতভাবে গ্রেনেড ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে। এছাড়া সিত্তওয়ের পি তা থা ওয়ার্ডের মতো জনাকীর্ণ বেসামরিক এলাকায় ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে শহর ছাড়তে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে আরাকান আর্মি শহরে ভারী কামানের গোলাবর্ষণ করতে দ্বিধাবোধ করে এবং বেসামরিক মানুষদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আরাকান আর্মির সমন্বয় ব্যবস্থা ভেঙে দিতে জান্তা সরকার পুরো রাখাইন রাজ্যে বিদ্যুৎ, ব্যাংকব্যবস্থা এবং মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ কেটে দিয়ে এক ভয়াবহ ব্ল্যাকআউট তৈরি করেছে। তবে এই নিষ্ঠুর কৌশল সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম মাত্রায় বাড়ালেও আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রাকে বিন্দুমাত্র dimate পারছে না।
গত কয়েক দিনের এই তীব্র লড়াই ও জান্তার নির্বিচার বিমান হামলার কারণে কিয়াকফিউ ও সিত্তওয়ে অঞ্চল থেকে নতুন করে ৮,০০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, এবং প্রতিদিন এই শরণার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তীব্র ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্ল্যাকআউটের কারণে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো সেখানে পৌঁছাতে পারছে না, যার ফলে এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও এক নজিরবিহীন স্বনির্ভরতা ও একতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাখাইন সম্প্রদায়। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাখাইন ডায়াসপোরা বা প্রবাসী নাগরিকরা গোপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা সেই অনুদানের টাকা ব্যবহার করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে সীমান্ত পার করে জরুরি ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী এনে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শরণার্থীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এই মানবিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা জান্তার অর্থনৈতিক অবরোধকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
আরাকান আর্মির সামরিক আধুনিকায়ন এবং রণকৌশলের অভূতপূর্ব পরিবর্তনই মূলত জান্তার আধুনিক ও সুসজ্জিত সেনাবাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। অতীতে মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে নৌবাহিনীর জাহাজে আঘাত করার মতো ভারী বা আধুনিক অস্ত্র ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এএ ড্রোনের আধুনিকায়ন, দূরপাল্লার ভারী মর্টার এবং অ্যান্টি-শিপ কামানের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি জান্তার যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানতে শুরু করেছে। জান্তার বিমান হামলা থেকে বাঁচতে তারা ‘হিট অ্যান্ড রান’ এবং ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের আশ্রয় নেওয়ার কৌশল নিখুঁতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিমান আসার সংকেত পেলেই তারা বাঙ্কারে লুকিয়ে পড়ে এবং বিমান চলে যাওয়া মাত্রই জান্তার স্থল ঘাঁটিতে দ্বিগুণ শক্তিতে হানা দেয়। একই সঙ্গে তারা জান্তা সৈন্যদের উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে মনোবল ভেঙে যাওয়া শত শত জান্তা সেনা এবং তাদের পরিবার অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছে। আরাকান আর্মির প্রধান কমান্ডার টুন মিয়াত নাইং দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, ২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইনের বাকি তিনটি টাউনশিপ সম্পূর্ণ মুক্ত করে একটি ‘স্বাধীন ও মুক্ত আরাকান’ গঠন করা হবে এবং এই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই থামবে না।
রাখাইনের এই যুদ্ধ এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধ বা সাধারণ কোনো বিদ্রোহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রটির ভেঙে পড়ার এবং একটি নতুন আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের চূড়ান্ত পর্বকে নির্দেশ করছে। এই যুদ্ধক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে। চীন এতকাল মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারকে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে আসলেও, কিয়াকফিউ মেগাপ্রজেক্টের বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তারা এখন গোপনে আরাকান আর্মির সাথেও যোগাযোগ ও সমঝোতা বাড়াতে শুরু করেছে। কারণ বেইজিং খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে যে, রাখাইনের ভবিষ্যৎ প্রকৃত শাসক হতে যাচ্ছে আরাকান আর্মি নিজেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকেও এই যুদ্ধের একটি বড় তাৎপর্য রয়েছে। রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে আরাকান আর্মির হাতে চলে গেলে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন ও নাফ নদী সীমান্তে জান্তাবাহিনীর দীর্ঘদিনের উসকানিমূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত গোলাবর্ষণ চিরতরে বন্ধ হতে পারে, যা সীমান্ত সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এই যুদ্ধকালীন অন্তর্বর্তী ও সংঘাতময় সময়ে নতুন করে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বা রাখাইন শরণার্থীদের অনুপ্রবেশের একটি বড় মানবিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। রাখাইনে জান্তার সামরিক কর্তৃত্ব এখন কেবল সিত্তওয়ে এবং কিয়াকফিউর নৌঘাঁটির চার দেয়ালের ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখান থেকে তাদের সামনে এখন কেবল দুটি পথই খোলা রয়েছে— হয় সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা, না হয় সাগরে পালিয়ে যাওয়া।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত