তেহরানের সাথে তীব্র সংঘাত চলাকালীন মধ্যপ্রাচ্য ও এর সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলের গড়ে তোলা এক বিশাল এবং নজিরবিহীন গোপন সামরিক নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানকে কোণঠাসা করতে এবং দেশটির অভ্যন্তরে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরালো করতে তেহরানের তিন দিকের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে অত্যন্ত গোপনে বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ও অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করেছিল তেল আবিব। এই অভিযানের সাথে সরাসরি যুক্ত চারজন নির্ভরযোগ্য উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাতে সিএনএন এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মূলত ভৌগোলিক দূরত্বকে জয় করে ইরানের মূল ভূখণ্ডে নিখুঁত ও বিধ্বংসী হামলা চালানোর নেপথ্যে এই গোপন ঘাঁটিগুলোই ছিল ইসরায়েলের প্রধান হাতিয়ার, যার মাধ্যমে তারা ইরানকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও বিস্ফোরক অংশটি হলো ইরানের উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন আজারবাইজানের ভূমিকা। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিশেষ এলিট কমান্ডো এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা দক্ষিণ আজারবাইজানের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গোপন আস্তানায় অবস্থান নিয়েছিলেন। এই অগ্রবর্তী সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে ইরানের অন্যতম প্রধান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর তাবরিজের দূরত্ব ছিল মাত্র ৬০ মাইল। যুদ্ধ চলাকালীন এই কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে গভীর নজরদারি চালানো এবং স্পর্শکاتর তথ্য সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করে। শুধু তাই নয়, এই ঘাঁটি থেকে ইরানের উত্তর সীমান্তে অত্যাধুনিক ড্রোন পরিচালনাও করা হতো।
কূটনৈতিক মহলে এই তথ্য ফাঁসের পর আজারবাইজানের দীর্ঘদিনের গোপন সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে। জানা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে, যখন ইরানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক বিক্ষোভ দমনের ঘটনা ঘটছিল, তখনই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তাদের অত্যাধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে অত্যন্ত গোপনে আড়িপাতার যন্ত্র ও উন্নত গোয়েন্দা সরঞ্জাম স্থাপন করে। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর ইসরায়েলের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার বাকু সফর করে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
সূত্র মতে, এই আজারবাইজান ঘাঁটি ব্যবহার করেই গত ৪ মার্চ ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর শীর্ষ গোয়েন্দা প্রধান রহমান মোকাদ্দামকে একটি সুনির্দিষ্ট ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়। মোকাদ্দামের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ ছিল। এই হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরদিন আজারবাইজানের নাখচিভান বিমানবন্দরে আরেকটি রহস্যময় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটলে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছিলেন। যদিও ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আজারবাইজান দূতাবাস সিএনএন-এর এই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, বাকু ও তেল আবিবের মধ্যকার গভীর বাণিজ্যিক ও সামরিক স্বার্থের সম্পর্ক অত্যন্ত প্রাচীন। আজারবাইজান যেখানে ইসরায়েলের মোট খনিজ তেলের চাহিদার একটি বিশাল অংশ সরবরাহ করে, তার বিনিময়ে ইসরায়েল তাদের কাছে ‘আয়রন ডোম’সহ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বিক্রি করে আসছে, যা অতীতে নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল।
কেবল উত্তর সীমান্তই নয়, ইরানকে দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে অবরুদ্ধ করতে আরও বেশ কিছু দুর্গম অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে অবস্থিত স্বঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র সোমালিল্যান্ডের গোপন ঘাঁটিটি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীকে দূরপাল্লার অভিযানের সময় এক বিশাল কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে। এখান থেকে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ইরানে দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানোর পর যাত্রাবিরতি এবং জ্বালানি নেওয়ার লজিস্টিক সুবিধা পেয়েছিল। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ডিসেম্বরে ইসরায়েল বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে diplomatic বা কূটনৈতিকভাবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে, যা মূলত এই সামরিক সুবিধারই একটি কৌশলগত বিনিময় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
can অন্যদিকে, ইরানের ঠিক পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত ইরাকের অভ্যন্তরেও দুটি গোপন লজিস্টিক ও জরুরি উদ্ধারকারী ঘাঁটি পরিচালনা করত ইসরায়েল। যুদ্ধের প্রথমার্ধে এই ঘাঁটিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল জরুরি পরিস্থিতিতে যদি কোনো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান বা পাইলট ইরানি সীমানার কাছাকাছি কোনো কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়, তবে তাদের দ্রুত অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা। পরবর্তীতে এই অবস্থানগুলোর পরিধি বাড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ও গোয়েন্দা নজরদারি কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়, যা মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতেও পরবর্তীতে স্থান পায়।
ইরানের দক্ষিণ সীমান্তে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে এবং তেহরানের সম্ভাব্য বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধ করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও (ইউএই) নিজেদের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল ইসরায়েল। সংঘাত চলাকালীন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি তাদের বিখ্যাত ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ সচল করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগরে ইরানের আইআরজিসির আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব ও নৌ-তৎপরতা মোকাবিলা করা এবং তেল আবিবের মিত্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বহুজাতিক গোপন নেটওয়ার্কের কারণে ইরান যুদ্ধ চলাকালীন এক অদৃশ্য ও চতুর্মুখী সামরিক ফাঁদে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ইসরায়েল তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে শত শত মাইল দূরে অবস্থান করেও প্রতিবেশী দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে ইরানের ভেতরে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিধ্বংসী আক্রমণ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে, যেখানে একটি দেশের sovereignty বা সার্বভৌমত্বকে আঘাত করতে তার প্রতিবেশীদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় তৃতীয় কোনো পক্ষ তাদের সীমান্ত ব্যবহার করছে। সিএনএন-এর এই চাঞ্চল্যকর উন্মোচনের পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে।