বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ রোববার থেকে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ঐতিহাসিক বিদেশ সফর শুরু করছেন। প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে তিনি পর্যায়ক্রমে মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন। নতুন সরকারের এই প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্যটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যম ও কৌশলগত মহলে ব্যাপক কৌতুহল এবং নিবিড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নয়াদিল্লির বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে বেইজিং ও কুয়ালালামপুরকে প্রথম সফরের জন্য বেছে নেওয়া ঢাকার নতুন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। কারণ, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানরা দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরের গন্তব্য হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকেই বেছে নিতেন। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এমন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন চীনা কূটনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুসারে, শনিবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, আজ রোববার মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই দ্বিপক্ষীয় সফর শুরু হচ্ছে। রোববার ও সোমবার—এই দুই দিন মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে ঢাকা মূলত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী নেওয়ার জন্য কুয়ালালামপুরের কাছে বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাবে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে সরাসরি চীনে পৌঁছাবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশি শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, প্রধানমন্ত্রীর এই আসন্ন চীন সফরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রকল্পভিত্তিক চীনা নতুন অর্থায়ন, ঋণ ও প্রযুক্তিগত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে বেইজিংয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
এর আগে গত মে মাসে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে আরও এগিয়ে নিতে, দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা জোরদার করতে, বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করতে এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত অংশীদার হতে সর্বদা প্রস্তুত। জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট ও অর্থনীতিতে চীনের অব্যাহত সমর্থন ও বিপুল সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দুই দেশের সর্বাত্মক বন্ধুত্ব ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও গভীর করার ওপর জোর দেন এবং দুই দেশের বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। ড. খলিলুর রহমান বেইজিংয়ে আরও জানান, বাংলাদেশ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশে নতুন করে বড় বিনিয়োগে স্বাগত জানায় এবং তাদের জন্য একটি স্থিতিশীল, ইতিবাচক ও পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস আজ রোববার এক বিশেষ প্রতিবেদনে লিখেছে, বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং দেশের ভেতরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যেই প্রথম বিদেশ সফরের জন্য তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। তবে একই সাথে উদ্বোধনী সফরে ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত তাঁর নতুন পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। কারণ, অতীতে বাংলাদেশের যেকোনো নতুন সরকারের ক্ষেত্রে ভারতই সাধারণত প্রথম গন্তব্য হয়ে থাকত। দেশটির আরেক শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুও একই সুর মিলিয়ে জানিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী এবং উদ্বোধনী সফরের গন্তব্য হিসেবে নিকট প্রতিবেশী ভারতকে দৃশ্যত এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
অবশ্য এর আগে গত মার্চ মাসে তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি মোদির পক্ষ থেকে পাওয়া ভারত সফরের আমন্ত্রণ সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে বিগত এক সময়ের টানাপোড়েনের পর দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসের একটি বৃহত্তর ও ইতিবাচক প্রচেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল বলে ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল।
ভারতীয় গণমাধ্যমের এই নিবিড় ও গভীর নজরদারি মূলত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতারই বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ সময় ধরে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ছিল এবং দুই দেশ নানামুখী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছিল। তবে ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের নাটকীয় পতনের পর দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। সম্পর্কটি এখনো এক ধরনের পুনর্বিন্যাস ও মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এটি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারেনি বলে চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাকে জানিয়েছেন সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক চিয়ান ফেং।
চীনা গবেষক চিয়ান ফেং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ভারতের গণমাধ্যম ও কৌশলগত মহলের একটি বড় অংশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহ্যগত মোড়লগিরি বা একচ্ছত্র নেতৃত্বের ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই সমস্ত আঞ্চলিক বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করছে। ফলে বেইজিং-ঢাকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামান্য ঘনিষ্ঠ হলেও তা দক্ষিণ এশিয়ায় নয়াদিল্লির আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতের একচেটিয়া অবস্থান দুর্বল হতে পারে বলে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা কোনো নির্দিষ্ট তৃতীয় পক্ষকে বা ভারতকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটিকে কেবল শীতল যুদ্ধকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয় বলেও কড়া মন্তব্য করেন চিয়ান ফেং। বেইজিংয়ের এই অবস্থানের সাথে সুর মিলিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মে মাসেই স্পষ্ট করে বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে পরিচালিত নয় এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের নাক গলানো বা আপত্তির কারণে বেইজিংয়ের এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কোনোভাবেই প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। একবিংশ শতাব্দীর এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলগত স্বাধীনতাকে অন্য কোনো দেশের শুধু ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চশমা দিয়ে দেখা মোটেও সমীচীন নয়।
সূত্র: আজকের পত্রিকা