বাংলাদেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ আজ এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার যে জনপ্রিয় মাধ্যমটি সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার কবচ হিসেবে কাজ করত, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থসংকটে সেটি এখন নিজেই রুগ্ন দশায়। সরকারি এই টেলিহেলথ সার্ভিসের সঙ্গে বেসরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। সেই সঙ্গে গত ২২ মাস ধরে কোনো ধরনের পেমেন্ট না পাওয়ায় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি তাদের জনবল অর্ধেক কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ফোন করেও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না, যা দেশের ডিজিটাল স্বাস্থ্য খাতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
২০১৫ সালে চালু হওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য বাতায়ন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির চরম দুঃসময়ে, যখন হাসপাতালগুলোতে সশরীরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন এই হটলাইনটি কোটি কোটি মানুষের জন্য সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মহামারির ওই কঠিন সময়েই হটলাইনটিতে ১ কোটি ৯ লাখের বেশি কল এসেছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত এই সেবার মাধ্যমে ২ কোটি ৭২ লাখেরও বেশি কল হ্যান্ডেল করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের কাছে এটি কতটা আস্থাশীল ও অপরিহার্য একটি মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে সেই আস্থার জায়গায় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।
সিনেসিস আইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরীর মতে, তাদের টিকে থাকাটাই এখন চ্যালেঞ্জের বিষয়। গত এপ্রিলের শেষভাগে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন একটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী দরপত্র প্রক্রিয়া প্রয়োজন, তা সম্পন্ন করতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাত্র ছয় মাসের একটি মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যা কোনোভাবেই একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। উপরন্তু, ফাইলটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে থাকায় কার্যত দুই মাস এমনিতেই পেরিয়ে গেছে। সোহরাব আহমেদের দাবি, যদি আজকেও এই মেয়াদ বাড়ানো অনুমোদন করা হয়, তবুও হাতে থাকবে মাত্র চার মাস সময়। এরপরই আবার সেই একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
সরকারি অর্থায়নের এই সংকট মূলত শুরু হয়েছিল গত বছরের জুন মাস থেকে। চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রামের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবং পঞ্চম প্রোগ্রামের প্রস্তাবনা বাতিল হওয়ার কারণে একটি বিশাল অর্থায়ন শূন্যতা তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীতে একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে, কিন্তু প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্বসহ নানা প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে সেই প্রকল্পের কার্যক্রম এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে একদিকে যেমন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি গত ২২ মাস ধরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার বকেয়া বিল পায়নি, অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণ করে ডাক্তার ও কর্মীদের বেতন পরিশোধ করে সেবাটি চালু রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং কোনো সুরাহা না মেলায় তারা তাদের জনবল ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।
জনবলের এই বিশাল কর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবাগ্রহীতাদের ওপর। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কল আসত এবং প্রায় সব কলই রিসিভ করা সম্ভব হতো, সেখানে বর্তমানে জনবল সংকটে মাত্র ৩ থেকে ৩ হাজার ৫০০ কল গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এপ্রিল মাসে কল সেন্টারে ১ লাখ ৯৭ হাজার কল এসেছিল, যা মে মাসে কমে ১ লাখ ৮২ হাজারে নেমে এসেছে। এই সংখ্যাই বলে দেয়, সেবার মান ও সক্ষমতা কতটা নিচে নেমে গেছে। রোগীদের অভিযোগ, আগে যখনই কল করা হতো, তখনই চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সংযোগ পাওয়া যায় না।
এই হটলাইন ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষরা মনে করছেন, সরকারের কোনোভাবেই এই সেবা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। রিযাউল করিম নামের একজন নিয়মিত ব্যবহারকারী আক্ষেপ করে বলেন, বাইরে হাসপাতালে গিয়ে যে চিকিৎসা নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় হতো এবং টাকা খরচ করতে হতো, স্বাস্থ্য বাতায়নের মাধ্যমে তা নিমিষেই সম্ভব ছিল। তার মতো আরও হাজারো মানুষের প্রশ্ন, কেন এমন একটি জনবান্ধব ও জীবন রক্ষাকারী সেবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এভাবে মার খাবে? সাধারণ মানুষের মতে, এটি সরকারের একটি সফল উদ্যোগ এবং জনগণের স্বার্থে এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হলে তারা আশ্বাস দিয়েছেন যে, বিষয়টি তাদের নজরে আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের পরিচালক আবু আহাম্মদ আল মামুন জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছরের বাজেট থেকে বকেয়া বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া চলছে এবং জুলাই মাস থেকে নতুন করে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করার আশা করা হচ্ছে। তারা এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটিকে সচল রাখতে মন্ত্রণালয়ে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, দুই মাসের বেশি সময় ধরে সেই প্রস্তাব ফাইলে আটকে আছে। স্বাস্থ্য সচিব এম কামরুজ্জামান চৌধুরী অবশ্য বিষয়টি স্বীকার করেছেন যে, ফাইলে আটকে থাকাটা কাঙ্ক্ষিত ছিল না এবং তিনি এটি দ্রুত দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অভিজ্ঞদের মতে, কেবল অস্থায়ীভাবে মেয়াদ বাড়িয়ে স্বাস্থ্য বাতায়ন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি টেকসই অর্থায়ন কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। বিশেষ করে দরপত্র প্রক্রিয়াটি যদি সময়মতো শুরু না হয়, তবে এই সেবার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সিনেসিস আইটি প্রায় ১০ বছর ধরে যেভাবে এই সেবাটি সামলে আসছে, তাতে তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে সেবাটি এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্মটি অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য নির্ভর করে সেখানে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর সক্ষমতার ওপর। স্বাস্থ্য বাতায়ন সেই লক্ষ্য অর্জনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গত প্রায় এক দশক ধরে এটি কেবল চিকিৎসা পরামর্শই দেয়নি, বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মনে ভরসা যুগিয়েছে যে, রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। বর্তমান সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক স্তরে যে নতুন গতি এসেছে, সেই গতি যেন স্বাস্থ্য বাতায়নের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবাটির ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়—সেটাই এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা। কোনো অজুহাত বা আমলাতান্ত্রিক টানাপোড়েন যেন এই সেবাটিকে পুরোপুরি ‘কোল্ড’ বা নিস্তেজ করে না দেয়, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। নতুবা এর মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকে, যাদের একমাত্র ভরসা ছিল ১৬২৬৩ হটলাইন।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার