শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

ঘনঘন ভূমিকম্প: ঢাকার জন্য কি সংকেত দিচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলো নিয়মিতভাবে ভূমিকম্পের কম্পনে কেঁপে উঠছে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো নগরবাসীর মনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার খুব কাছাকাছি ঘনঘন কম্পন অনুভূত হওয়া একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই কম্পনগুলো কি কেবল স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস—এ নিয়ে এখন চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও ভৌগোলিক বাস্তবতা

গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে অনুভূত ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে, যা রূপগঞ্জ এলাকার আশেপাশে। এর আগেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এবং গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এই ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এগুলোর অধিকাংশই ঢাকা শহরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত।

বাংলাদেশ তিনটি বড় টেকটোনিক প্লেটের—ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ প্লেটের—সংযোগস্থলের মাঝামাঝি অবস্থিত। এই প্লেটগুলোর ক্রমাগত ঘর্ষণ এবং নড়াচড়ার ফলেই এখানে ভূমিকম্প হয়। তবে ঢাকার এত কাছে ঘনঘন কম্পনের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা গোপন চ্যুতি রেখার সক্রিয় হওয়াকে দায়ী করছেন। ব্লাইন্ড ফল্টগুলো ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত না হওয়ায় এদের অবস্থান আগে থেকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এই রহস্যময় চ্যুতি রেখাগুলোই ঢাকার জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

বড় ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বুয়েটের ভূমিকম্প গবেষকদের মতে, ঢাকার ঝুঁকি কেবল স্থানীয় ছোট কম্পনগুলোতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বড় ধরনের সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা একটি অঞ্চল। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সিলেট, শ্রীমঙ্গল, বগুড়া এবং ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় সাত মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। ১৮৮৫ সালে বগুড়ায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার এবং ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। গবেষকদের মতে, এই শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি নির্দিষ্ট ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা ফিরে আসার চক্র থাকে। সেই হিসেব অনুযায়ী, বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সময় যেকোনো সময় ঘনিয়ে আসতে পারে।

ঢাকার ভূতাত্ত্বিক ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি

ঢাকা শহরের ভূতাত্ত্বিক গঠন সর্বত্র সমান নয়। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, শহরের উত্তর দিকের এলাকাগুলো, যেমন—মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও, ধানমন্ডি বা মতিঝিলের মাটি বেশ শক্ত লাল মাটির স্তরের (মধুপুর ট্র্যাক্ট) ওপর অবস্থিত। ফলে এই এলাকাগুলো ভূ-তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা নিরাপদ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা নতুন আবাসিক এলাকাগুলোকে নিয়ে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তীরবর্তী অনেক এলাকা জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। এসব নরম পলিমাটির ওপর গড়ে ওঠা ভবনগুলোতে ভূমিকম্পের সময় ‘লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটি তরল হয়ে ভবন ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল।

আবার অবকাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরান ঢাকার সরু রাস্তা এবং শত বছরের পুরোনো ভবনগুলো বড় ধরনের কম্পনের সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। নতুন এলাকায় বহুতল ভবন তৈরি হলেও সেগুলোতে আধুনিক ভূমিকম্প সহনশীল প্রযুক্তির কতটা প্রয়োগ হয়েছে, তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী স্পষ্টভাবে বলেছেন, যতক্ষণ না প্রতিটি ভবন প্রকৌশলগতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া অসম্ভব।

কেন চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা?

নরসিংদী বা রূপগঞ্জের মতো জায়গায় যেভাবে একের পর এক ভূমিকম্পের কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদীতে বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস না থাকলেও সাম্প্রতিক কম্পনের ধারাটি বিশেষজ্ঞদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, এটি হতে পারে বড় কোনো প্লেট মুভমেন্টের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়ার মতে, অনেক সময় দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা পুরোনো ফল্ট নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঢাকার চারপাশের এই অস্থিরতা আমাদের জানা বা অজানা কোনো নতুন ফল্ট জোনের সৃষ্টিকে নির্দেশ করছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রস্তুতির অভাব ও আগামীর করণীয়

ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকার প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ চালানোর মতো সরু রাস্তা এবং সরঞ্জামের ব্যাপক অভাব রয়েছে। গবেষকদের মতে, একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকা শহরের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে। কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বা কিছু নিয়ম মেনে ভূমিকম্প বন্ধ করা সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

প্রথমত, প্রতিটি এলাকার মাটির গঠন অনুযায়ী নতুন করে জোনভিত্তিক নির্মাণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। নরম মাটিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার আগে কঠোর ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুরান ঢাকার জনঘনত্ব কমিয়ে সেখানে উদ্ধারকাজের উপযোগী প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করা বা অন্তত যান চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সব পুরোনো ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোকে ধাপে ধাপে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

সবশেষে, জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। মানুষ যদি আগে থেকে জানে কোন ধরনের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং দুর্যোগের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, তবে প্রাণহানির সংখ্যা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানের ছোট ছোট কম্পনগুলো যেন আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে কাজ করে। প্রকৃতির এই সংকেতকে অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। যদি ভবিষ্যতে বড় কোনো দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয়, তবে আমাদের প্রস্তুতিই হবে টিকে থাকার একমাত্র উপায়। এখনকার ভূমিকম্পগুলো আমাদের দিচ্ছে একটিই বার্তা—অপ্রস্তুত ঢাকাকে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে, তাই সময় থাকতেই যথাযথ সচেতনতা ও প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি।

 

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


এ জাতীয় আরো খবর...