শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

সিঙ্গেল মাদার: যার বুকে গ্রামভর্তি মানুষের সাহস

বাদল সৈয়দ / ৫ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

১ ) তাঁর কথা-
‘তখন সকাল সাতটা। আমি ছেলেকে নিয়ে নিয়ে স্কুলে গেছি। হঠাৎ এক ভাবির ফোন পেলাম। তিনি আমার সহকর্মীর স্ত্রী। তিনি জানতে চাইলেন, ‘আপনি কোথায়?’
আমি বললাম- ‘ আমি বাচ্চাকে নিয়ে ওর স্কুলে এসেছি। কোনো দরকার ছিল ভাবি?’
উনি সরাসরি বললেন- ‘না, মানে আমার স্বামী ঢাকায় যাচ্ছে। তাই জানতে চাইছি, আপনি তার সাথে আছেন কিনা?’
তাঁর অদ্ভুত কথা শুনে আমি বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেলাম। রাগে অন্ধ অবস্থা। আমি কঠিন কণ্ঠে বললাম- ‘ আপনার এ ধারণা হওয়ার কারণ?’
আমার রাগ দেখে তিনি কিছুটা থমকে গেলেন। বললেন, ‘না….মানে…. আপনি সিঙ্গেল তো তাই।’
রাগে-দুঃখে আমার চোখে পানি এসে গেলো। তা সামলে বললাম- ‘দয়া করে সিঙ্গেল হলেই মেয়েদের এত সহজলভ্য ভাববেন না। চিন্তা করে দেখুন, অনেক কারণেই আপনিও কাল সিঙ্গেল হয়ে যেতে পারেন। তখন কি আপনি আরেকজনের জামাইয়ের সাথে ঢাকা রওনা দিয়ে দেবেন? এই সিক মেন্টালিটির জন্য আপনার ডাক্তার দেখানো উচিত। আর আপনার হাজব্যান্ড রসগোল্লা না যে তাকে দেখলেই মেয়েরা খপ করে গিলে ফেলবে। পরে জানলাম, এই মহিলা তার স্বামী কোথাও গেলেই তার সহকর্মীসহ বিভিন্নজনকে একই কথা জিজ্ঞেস করেন। যাদের জিজ্ঞেস করেন সবাই সিঙ্গেল মাদার।’
এটি হচ্ছে আমার কাছে পাঠানো একজন সিঙ্গেল মাদারের মেসেজ। তিনি অনুরোধ করেছেন সমাজে তাঁদের যেসব সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় তা নিয়ে লিখতে।
সে প্রেক্ষিতে এ লেখা।
তাঁর মতে সিঙ্গেল মাদাররা যেসব সমস্যায় পড়েন সেগুলো হচ্ছে-
১। তাঁদের অন্যের অযাচিত কৌতূহল মোকাবেলা করতে হয়। অনেকেই কোনো কারণ ছাড়া জানতে চান, তিনি সিঙ্গেল কীভাবে হলেন। ডিভোর্স হলে তো প্রশ্নের ওজন হয় কয়েক টন বেশি। এ অন্যায় কৌতূহল সিঙ্গেল মাদারদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।
২। তাঁরা ঠিকানা কোথায়, মোবাইল নম্বর, বাড়িতে কে কে থাকে, বাচ্চা আছে কিনা এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক এবং অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হন।
৩। তাঁদের জন্য আরেকটি অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো, কর্মক্ষেত্রে অস্বস্তিকর পরিবেশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা সেখানে পুরুষ সহকর্মীদের অবাঞ্ছিত মনোযোগের কারণ হন।
৪। একটু আলাপ হলেই অনেক পুরুষ বন্ধুত্বের প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। ব্যাপারটা তারা খুব সহজ ভাবে। এদের অনেকেই বিবাহিত। ঘরে স্ত্রী-সন্তান আছে।
৫। তাঁদের অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত শুভাকাঙ্ক্ষী তৈরি হয়। এড়িয়ে যেতে চাইলেও তারা গায়ের সাথে লেগে থাকে। এরা সিঙ্গেল মাদারদের জীবনে অনেক বড় অভিশাপ।
৬। তাঁদের ছেলেমেয়েকে অযথা বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়।যেমন-
‘তোমার মা আলাদা হয়ে গেলো কেন?
‘তোমার বাবা কি তোমাদের খোঁজখবর রাখে?’
বাবা মারা গেলে প্রশ্ন করা হয়- ‘তোমাদের সংসার চলে কী করে?’
এ ধরনের প্রশ্ন সন্তানদের ট্রমায় নিয়ে যায়।
৭। তাঁদের নিয়ে গুজব ছড়াতে একদল লোক খুব পছন্দ করে। যা তাঁদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তোলে।
৮। অনেক সময় তাঁদের বাড়ি ভাড়া পেতে সমস্যা হয়- হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
৯। ডিভোর্স হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সব দোষ তাঁদের উপর চাপানো হয়। কেউ আসল কারণ খোঁজে না।
১০। সবচেয়ে কষ্টের হলো, মহিলারা সিঙ্গেল মাদারদের সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা অযথা তাদের সন্দেহ করে, দেখা হলে ভ্রু কুঁচকায়। তারাই বেশি গুজব ছড়ায়।
২ ) আমার কথা-
ভদ্রমহিলার কথা শোনালাম। এবার আমার এ বিষয়ে ভাবনা কী তা বলি।
আমি সবসময় একটি কথা বলি, তা হলো- একজন মাকে যদি আমরা একবার শ্রদ্ধা করি, একজন সিঙ্গেল মাকে তা করা উচিত লক্ষবার। কারণ তাঁর লড়াইটা কত কঠিন তা একমাত্র তিনিই জানেন।
সিঙ্গেল মাদারদের সাথে আচরণ করার সময় মাথায় রাখতে হবে, আগামীকাল কী ঘটবে আমি জানি না।
কে জানে কাল আমার স্ত্রী বা বোন সিঙ্গেল হবে না?
আমি যে আগামীকাল ঘুম থেকে উঠব তার নিশ্চয়তা আছে?
কিংবা
যে ভদ্রমহিলা সিঙ্গেল মাদারকে সন্দেহ করে তার জীবন অতিষ্ট করে তুলেছেন তাঁর স্বামীর যে আগামীকাল ঘুম ভাঙবে তার নিশ্চয়তা কী?
মানুষের দীর্ঘশ্বাস তৈরি করা ভালো নয়। প্রকৃতি তা ফিরিয়ে দেয়।
একটি প্রাচীন ইংরেজি প্রবাদ দিয়ে শেষ করি-
‘She Stands alone like a tall tree
Yet carries the strength of an entire village.’
‘সে বিশাল বৃক্ষের মতো
একা দাঁড়িয়ে আছে
কিন্তু তার বুকে লুকিয়ে আছে
গ্রামভর্তি মানুষের সম্মিলিত সাহস।‘
প্রত্যেক সিঙ্গেল মাদার একেকটি বিশাল বৃক্ষ। তিনি একা- কিন্তু তাঁর একলা বুকে পুরো গ্রামের মানুষের সাহস টগবগ করছে। নয়ত তিনি সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারতেন না।
#আসুন মায়া ছড়াই


এ জাতীয় আরো খবর...