আমার মেয়ে যখন টিনএজে পড়ল, তখন তার মধ্যে কিছু ব্যাপার খেয়াল করলাম, যেগুলো আমাকে কিছুটা চিন্তিত করে তুলল। যেমন দেখলাম—
১। আগে আমরা যা বলতাম, সে তা-ই মেনে নিত। এখন কিছু বললে তার পছন্দ না হলে চোখ পাকিয়ে খারিজ করে দেয়।
২। আগে সব সময় গায়ে লেগে থাকত, এখন মাঝে মাঝে একা থাকতে চায়।
৩। বিভিন্ন নিয়ম-কানুন, যা তাকে শিখিয়েছি, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
৪। পরিবারের চেয়ে বন্ধু-বান্ধবকে গুরুত্ব বেশি দেয়।
একদিন আমার স্ত্রীকে আমার চিন্তার কথা জানালাম। সে হেসে বলল, ‘এই ব্যাপারগুলো নিয়ে তুমি চিন্তিত, তাই না?’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘চিন্তিত হব না?’
সে বলল, ‘চলো মার সঙ্গে একটু গল্প করি।’
আমি আরো অবাক হয়ে বললাম, ‘মার সঙ্গে গল্প করার সঙ্গে এ ব্যাপারটির সম্পর্ক কী?’
সে ফিচেল হাসি হেসে বলল, ‘আচ্ছা, মার সঙ্গে গল্প করতে হবে না। তোমার চিন্তার অবসান আমিই ঘটাচ্ছি।’
সে উত্তর দিল, ‘মার মুখে শুনেছি, ছোটবেলায় তুমি খালি ওনার সঙ্গে তর্ক করতে। তাতে না পারলে চিৎকার করে ঘর মাথায় তুলতে। তোমার মেয়ে তো তোমার কথা পছন্দ না হলে চোখ পাকায়, তুমি নাকি পানিভর্তি ড্রাম উল্টে দিতে।
ওর একা থাকা নিয়ে চিন্তা করছ? তুমি ক্লাস এইটে থাকার সময় পড়ার টেবিলে লিখে রেখেছিলে— ‘প্রাইভেট প্রপার্টি— নো এন্ট্রি।’ বলতে বলতে সে বিশাল হাসি দিয়ে বলল, ‘পড়ার টেবিলে এই অদ্ভুত কথা লেখার বুদ্ধি কোথায় পেয়েছিলে? টেবিলে কেউ ঢুকতে পারে নাকি? মনে হয় কোনো টিভি সিরিয়ালে কথাটা দেখেছিলে, তাই বেজায়গায় লিখে ফেলেছিলে।’ বলতে বলতে সে আবার হাসিতে গড়িয়ে পড়ল।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তোমাকে কী বলতে এলাম আর তুমি কী রাজ্যের ইতিহাস শুরু করলে! তোমাকে বলাই উচিত হয়নি।’
সে হাত বাড়িয়ে আমাকে থামিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও, আরো আছে। ওই বয়সে মেয়ে নিয়ম-কানুন মানতে চাইতে না বলে তুমি বড়ই চিন্তিত, কিন্তু তুমিও ওর বয়সে নিয়ম মানতে চাইতে না। প্রতিদিন ভোরে উঠতে হবে কেন? সন্ধ্যায় বসতে হবে কেন? রাতে এক গ্লাস দুধ খেতে হবে কেন? এগুলো নিয়ে তুমি বাসায় মারাঠা বিদ্রোহ জারি করেছিলে।’
আমি রাগ করে বললাম, ‘দূর! তোমার সঙ্গে আলাপ করতে আসাই ঠিক হয়নি।’
সে আমার বিরক্তি পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘এই বয়সে তুমিও বন্ধুদের বেশি গুরুত্ব দিতে। মানিক ভাই বাসার নিচে এসে ‘কু কু’ করে আওয়াজ করত, সেটা শুনলে দুনিয়াকে রসাতলে রেখে দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে।’
চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আমি ভুল করেছি বলে কি মেয়েকেও ভুল করতে দেবো?’
সে হাই তুলে বলল, ‘তুমি ভুল করোনি। বরং যা করেছ, তা ভালো লক্ষণ। তোমার মেয়ের ক্ষেত্রেও তাই।’
‘মানে?’ খুব বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
১। সে মুখে মুখে তর্ক করছে মানে তার মতামত গড়ে উঠছে। সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখছে। অন্ধভাবে আমাদের কথা শুনছে না। তার মধ্যে লজিক্যাল মাইন্ড ডেভেলপ করছে। তাই যেটিকে সে অযৌক্তিক ভাবছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এটি কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষের নিজের মতো চিন্তা করার ক্ষমতা থাকে না, বিনা বাক্যব্যয়ে অন্যের কথা মেনে নেয়, তার নিজস্ব সত্ত্বা গড়ে ওঠে না। সে হয় অন্যের ছায়া মাত্র।
২। সে মাঝে মাঝে একা থাকতে চায় মানে তার মধ্যে প্রাইভেসির গুরুত্ব বাড়ছে। এটি প্রতিটি মানুষের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বড়রা কি মাঝে মাঝে একা থাকতে চাই না? কেন চাই? আমরা এটি চাই, কারণ মাঝে মাঝে একদম একা থাকতে, নিজের মতো সময় কাটাতে ভালো লাগে। এই জন্যই তুমি পড়ার টেবিলে লিখে রেখেছিলে— ‘প্রাইভেট প্রপার্টি— নো এন্ট্রি।’
বাক্যটি হাস্যকর হলেও তোমার চাওয়াটা ছিল তোমার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার লক্ষণ। তোমার মেয়ের ক্ষেত্রেও তাই। যার প্রাইভেসি সেন্স নেই, তার আসলে ব্যক্তিত্বও নেই। কারণ যে নিজের প্রাইভেসির গুরুত্ব না বুঝলে, সে তো নিজ জীবনের মূল্যই বোঝে না। আবার অন্যের প্রাইভেসিও তার কাছে মূল্যহীন। দুটোই ভালো ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে যায়।
৩। সে নিয়ম মানতে চাইছে না? এটা খারাপ কেন হবে? সে আসলে নিয়মগুলোর কারণ কী, তার উত্তর খুঁজছে। তার মানে ওর মধ্যে র্যাশনালিটি ডেভেলপ করছে। সে সবকিছুর যুক্তি খুঁজছে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, নিয়মগুলোর পেছনে কী যুক্তি আছে, তা তাকে বোঝানো। বোঝাতে পারলেই সে মেনে নেবে। তাহলে একসঙ্গে তার দুটো গুণের বিকাশ হবে— যুক্তি খোঁজা এবং যুক্তি মেনে নেওয়া। দুটোই ভালো লক্ষণ। যার মধ্যে যুক্তিবোধ থাকে, সে সহজে ভুল করে না।
৪। বন্ধুদের সঙ্গে বেশি ব্যস্ত, তার মানে সে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শিখছে। সে তো শুধু আমাদের সঙ্গে মিশলে চলবে না। জীবনে চলার পথে তাকে অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, বন্ধুত্ব করতে হবে। সে এই চর্চা শুরু করেছে। সেটা ভালো না, সে একা মুখ গুঁজে পড়ে থাকলে, কারো সঙ্গে না মিশলে সেটা ভালো হতো? শুধু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, সে যাতে ভুল বন্ধু বাছাই না করে।
‘সবচেয়ে বড় কথা, এই বয়সে এসব তুমিও করেছ। আমিও করেছি। তাতে কি আমাদের জীবন বরবাদ গেছে? যায়নি। এগুলো এ বয়সের বিকাশের লক্ষণ। শুধু সীমা ছাড়িয়ে না গেলেই হয়। সো, নো ওরিজ।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘ঠিক আছে, নো ওরিজ, কিন্তু তুমি আমার এত কিছু জানলে কীভাবে?’
সে চোখ মটকে উত্তর দিলো- ‘বউদের জামাইয়ের ইতিহাস মুখস্থ রাখতে হয়। কারণ ভূগোল যাই হোক, ইতিহাস অবশ্যই ভালো হতে হবে।’
আমি বসে আছি। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে চায়ের মিষ্টি সুবাস।
– আসুন মায়া ছড়াই
এ জাতীয় আরো খবর...