শিরোনামঃ
বঙ্গোপসাগরে দুই এশীয় পরাশক্তির করিডোর যুদ্ধ আর্জেন্টিনা হারতেই পরীমণির স্বস্তির পোস্ট প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেলেন রাশেদ খাঁন আয় ‘খোকা’ আয়: হেমন্তের গানটি যখন উল্টে যায় সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব কেন হয়? আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী কাশিমপুর কারাগার থেকে নারী বন্দির পলায়ন: জেলার শিরিন সাময়িক বরখাস্ত ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নিশ্চিতে নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার গড়ার ওপর প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ মেজর মোজাফফরের বিচার হবে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব পলাতক সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন

নতুন পে স্কেলে বাড়বে আয়বৈষম্য : উসকে যেতে পারে মূল্যস্ফীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো যেখানে দুলভ হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আলু, পটল, মাছ, মাংস ও ডিমের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম প্রতিদিন মানুষের ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা একদিকে যেমন সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারীর মনে স্বস্তি ফেরাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করবে কি না তা নিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বল্প আয়ের বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় যেখানে অপরিবর্তিত রয়েছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ এলে অসাধু ব্যবসায়ীরা পুনরায় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডক্টর মাহফুজ কবিরের মতে, নতুন পে স্কেল প্রবর্তন কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলে এটি দেশের মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও তারল্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর নিয়ম অনুযায়ী মূল বেতনের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আর কোনো নতুন পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো চালু করা হয়নি। দীর্ঘ ১১ বছরের এই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে ২০২৫ সালে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ বেতন কমিশন গঠন করে। উক্ত কমিশন গত জানুয়ারিতে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে পদমর্যাদা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর জোরালো প্রস্তাব করা হয়। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ধাপের বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে বিশ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০০ টাকা করার কথা বলা হয়। সেই সঙ্গে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা এবং যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল, যা বাস্তবায়নে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।

পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে বর্তমান বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি নতুন একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে, যেখানে বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিম্নধাপের কর্মীদের অপেক্ষাকৃত বেশি আর্থিক সুবিধা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে দায়িত্বশীল মহল নিশ্চিত করেছে। খুব শীঘ্রই খসড়াটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে এবং অনুমোদন মিললে চলতি মাসের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তা কার্যকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দশ বছরে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি যেভাবে লাফিয়ে বেড়েছে, তাতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল দেওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্তটি কার্যকর হতে যাচ্ছে, যখন সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতি নিজেই নানা ধরণের সংকট ও চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এখনও ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং বা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ডক্টর সেলিম রায়হানের মতে, বাজারে অতিরিক্ত অর্থের যোগান বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। সরকারকে নতুন বেতন স্কেলের বিশাল ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হবে অথবা নতুন টাকা বাজারে ছাড়তে হবে, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়বে নিত্যপণ্যের দামের ওপর। সরকারি চাকুরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও বাজারে যদি সেই অনুপাতে পণ্যের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে কৃত্রিম সংকটের সুযোগ নিয়ে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে। এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি হতে পারে বৈষম্য নিয়ে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার, যেখানে বেসরকারি খাতে কাজ করেন প্রায় ছয় কোটি ৯৭ লাখ মানুষ। অর্থাৎ দেশের মোট শ্রমশক্তির ৯৫ শতাংশ মানুষই বেসরকারি খাতে নিয়োজিত, যাদের আয় এই হারে বাড়ছে না। ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের আয়ের মধ্যকার ব্যবধান বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

আয়ের এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্য দেশের সার্বিক দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তথ্য বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২১.৪ শতাংশে। বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় যদি মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ে, তবে সাধারণ পরিবারগুলো আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়বে। অন্যদিকে নতুন বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের অর্থ বরাদ্দের বড় অংশই চলে যাচ্ছে এই খাতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যা পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ দাঁড়ায় এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়। নিট জনপ্রশাসন খাতে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকাই রাখা হয়েছে পে স্কেলের জন্য। অতিরিক্ত এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আয় একই গতিতে না বাড়ায় দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও চাপ সামলাতে সরকার সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন যে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পহেলা জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। হুট করে পুরো টাকা বাজারে না ছেড়ে প্রথম দুই অর্থবছরে কেবল মূল বেতন বা বেসিক ৫০ শতাংশ করে বাড়ানো হবে এবং তৃতীয় বছরে গিয়ে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে। সরকারের ধারণা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে দেশের সামগ্রিক বাজার ও বাজেটের ওপর হঠাৎ করে কোনো চরম আঘাত আসবে না। পরিশেষে, নতুন পে স্কেলের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত সুখবর বয়ে আনবে নাকি বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও অস্থির করে তুলবে, তা নির্ভর করবে সরকারের কঠোর বাজার মনিটরিং ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


এ জাতীয় আরো খবর...