কয়েকদিন থেকে প্রশ্নটি মাথায় ঘুরছিল।
আমার মেয়েটা বড় হচ্ছে। কয়েক বছর পর সে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে।
ধীরে ধীরে জীবনের অ্যালবাম পুরোনো হবে। একসময় সে আমার বয়সে পৌঁছাবে।
তখন কি সে আমাকে আজকের মতো অনুভব করবে? মিস করবে?
আমি প্রশ্নের উত্তরটা বড় আপার কাছে খুঁজলাম।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপা, তোমার এখন ভরা সংসার, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে তুমি খুব ব্যস্ত। আচ্ছা, আব্বাকে তুমি কি এখনো আগের মতো ফিল করো?’
সে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ নামিয়ে বলল, ‘আমি তোকে ব্যাপারটা লিখে জানাই?’
কিছুক্ষণ পর তার লেখাটি পেলাম।
সে লিখেছে, ‘আব্বা বেঁচে থাকলে আমি কি কি করতাম তা লিখে পাঠালাম। এটি পড়লেই বুঝতে পারবি, আব্বার জন্য আমার অনুভূতি এখন কী রকম?’
১) প্রতিদিন সকালে আব্বার পাশে বসে থাকতাম। যাতে চোখ খুললেই তিনি আমাকে দেখতে পান।
২) ঠিক যেভাবে তিনি আমাকে হাতমুখ ধোয়ার জন্য বাথরুমে নিয়ে যেতেন, আমিও ঠিক তেমনিভাবে তাকে বাথরুমে নিয়ে যেতাম।
৩) আদর করে নাস্তা করতাম-যেমনটি তিনি আমাকে করাতেন।
৪) নাস্তা করার পর আরো কিছুক্ষণ তাঁর সাথে থেকে আমি আমার বাসায় চলে আসতাম।
৫) বিকেলে আবার আব্বার কাছে গিয়ে ধরে ধরে তাঁকে হাঁটাতাম- ঠিক এমনিভাবে তিনি আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন।
৬) আব্বা স্মার্ট চলাফেরা পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে তাঁকে ইস্ত্রি করা প্যান্ট-শার্ট পরিয়ে গাড়ি করে ঘুরিয়ে আনতাম। মাঝখানে কোনো আইসক্রিমের দোকানে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম কিনতাম। দুজনে মিলে আইসক্রিম খেতাম। ঠিক ছোটোবেলার মতো।
৭) আমি জানি আব্বা বেঁচে থাকলে তুই (আমার কথা বলা হচ্ছে) অফিস থেকে না আসা পর্যন্ত বিকেলের নাস্তা করতেন না। আমি আব্বার পাশ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরতাম না। তুই আসার জন্য অপেক্ষা করতাম। তারপর সবাই মিলে নাস্তা করতাম।
৮ ) আব্বার পিঠে, বুকে, মুখে হাত বুলাতাম। তাঁর গায়ে পাউডার লাগিয়ে দিতাম।
৯) মাস শেষে আমার পেনশনের টাকা তুলে এনে তাঁর হাতে দিয়ে বলতাম, আপনার যা ইচ্ছা কিনবেন।
১০) আব্বা চিংড়ি মাছ খুব পছন্দ করতেন। আমি খুঁজে খুঁজে বাজার থেকে সবচেয়ে ভালো চিংড়ি মাছ এনে আব্বাকে রান্না করে খাওয়াতাম।
সবার শেষে আপা লিখেছে, “সত্যি বলতে কী আব্বার ব্যাপারে লেখার পর থেকে বুকের ভেতর হু হু করছে। মনে হচ্ছে, বুক ভরে কান্না জমে আছে। মেয়ের কাছে বাবা কখনো আবছা হয় না। তাদের বয়স হলে কেবল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া গানটির ভাষাটা বদলে যায়-
‘ আয় খুকু আয়’ না গেয়ে তারা গায়, ‘আয় খোকা আয়।’
তখন খুকু হয়ে যায় মা- বাবা হয়ে যান খোকা।
রোজের কাছেও তুই কখনো আবছা হবি না। বুকের ভেতর ‘খোকা’ হয়ে বেঁচে
থাকবি।”
এ জাতীয় আরো খবর...