শিরোনামঃ
বঙ্গোপসাগরে দুই এশীয় পরাশক্তির করিডোর যুদ্ধ আর্জেন্টিনা হারতেই পরীমণির স্বস্তির পোস্ট প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেলেন রাশেদ খাঁন আয় ‘খোকা’ আয়: হেমন্তের গানটি যখন উল্টে যায় সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব কেন হয়? আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী কাশিমপুর কারাগার থেকে নারী বন্দির পলায়ন: জেলার শিরিন সাময়িক বরখাস্ত ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নিশ্চিতে নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার গড়ার ওপর প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ মেজর মোজাফফরের বিচার হবে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব পলাতক সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন

আইএমএফের নতুন ঋণ পেতে কমাতে হবে ভর্তুকি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচি এবং নতুন ছয় দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য অর্থায়নের আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের বর্তমান ভর্তুকিনীতি। বৈশ্বিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে দেওয়া সরকারি ভর্তুকি ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ কমিয়ে আনার জোর সুপারিশ জানিয়ে আসছে। কিন্তু দেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন জাতীয় বাজেটে সরকার উল্টো ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ আরও প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন আইএমএফের শর্তানুযায়ী কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ কর্মসূচির দর-কষাকষিও অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতের জন্য মোট এক লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরে ছিল প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে বরাদ্দ এত বড় অঙ্কে বৃদ্ধি পাওয়ায় আইএমএফের প্রতিনিধিদল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বাজেটের হিসাব-নিকাশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার খাতের ভর্তুকিই মূলত বাজেটের ওপর সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। কৃষিখাতে ২৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি অপরিবর্তিত রাখা হলেও, বিদ্যুৎ উৎপাদনের লাগামহীন ব্যয়, এলএনজি আমদানির উচ্চমূল্য এবং সামগ্রিক জ্বালানি খাতের ওপর তৈরি হওয়া বাড়তি চাপ পুরো ভর্তুকি বাজেটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে আইএমএফ প্রতিনিধিদল অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে বাজেটে ভর্তুকি বাড়ানোর এই পদক্ষেপে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। তাদের মতে, সরকারি বাজেটে নতুন করে ভর্তুকি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তটি পূর্ববর্তী চুক্তির সময় দেওয়া সংস্কার প্রতিশ্রুতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আইএমএফের নীতিনির্ধারকরা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন যে, বাংলাদেশ যে আর্থিক সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে, তার মূল চাবিকাঠি হলো ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সর্বজনীন লোকসান বন্ধ করে সেখানে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশকে বর্তমানে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানির বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের মতো একাধিক কঠোর শর্ত বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। সংস্থাটি স্পষ্ট মনে করে যে, ঢালাওভাবে সর্বজনীন ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে দেশের বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং সরকারি ঋণের বোঝা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক উন্নয়নমূলক বাজেট বরাদ্দের ওপর। আইএমএফের দেওয়া প্রেসক্রিপশন হলো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যকে তাদের প্রকৃত উৎপাদন খরচের সঙ্গে ধাপে ধাপে সমন্বয় করা উচিত। এতে করে সরকারের রাজকোষ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে। এই সাশ্রয়কৃত অর্থ সর্বজনীন ভর্তুকিতে অপচয় না করে কেবল প্রকৃত দরিদ্র ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরি সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় করা হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তবে আইএমএফের এই প্রস্তাবের বিপরীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় হুট করে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির ভর্তুকি তুলে নেওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও আত্মঘাতী হতে পারে। দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের তীব্র অস্থিরতা কাটেনি। এই নাজুক পরিস্থিতিতে যদি হঠাৎ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে দেশের উৎপাদনশীল শিল্প খাত সরাসরি স্থবির হয়ে পড়বে। এর ফলে কৃষি খাতের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় একেবারে নাগালের বাইরে চলে যাবে। সরকার মনে করছে, হঠাৎ করে মূল্য সমন্বয় করলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পপণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এই মুহূর্তে ভর্তুকি বহাল রাখা ছাড়া বিকল্প কোনো সহজ পথ নেই।

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো পূরণের পাশাপাশি নতুন করে অতিরিক্ত প্রায় সাড় ছয় বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে জটিল দর-কষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু আইএমএফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, নতুন ঋণ অনুমোদন পেতে হলে পূর্বের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিশেষ করে ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যথায় নতুন এই ঋণ প্যাকেজের অনুমোদন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। বাণিজ্য খাতের প্রতিনিধিরাও সরকারের এই ভর্তুকি বহাল রাখার নীতিকে সমর্থন জানিয়েছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের শীর্ষ প্রতিনিধিরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, শিল্প খাত এমনিতেই ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, গ্যাস সংকট এবং বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপে হাঁসফাঁস করছে। এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আর বাড়ানো হলে শিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থাও বজায় রাখা এবং দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, এই দুয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ঢাকা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...