২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের ছাত্র-জনতার বুক চিরে পিচঢালা রাজপথ তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে দেশের শীর্ষ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নেতাদের এক বিশাল অংশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি চরম আনুগত্য ও অন্ধ সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে যখন নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছিল, তখন সুবিধাভোগী এসব ব্যবসায়ী আন্দোলনকারীদের উল্টো ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে তাদের দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। দেশের এই সংকটাপন্ন সময়ে জনগণের পাশে না দাঁড়িয়ে গণভবনে আয়োজিত এক জরুরি সভায় তারা শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু দেশের মসনদে দেখার বাসনা ব্যক্ত করেন। রাজপথে রক্ত ঝরার মুখে ব্যবসায়ীদের এই প্রকাশ্য সমর্থন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের ওপর আরও দ্বিগুণ উৎসাহে দমন-পীড়ন ও গণহত্যা চালাতে সাহস জুগিয়েছিল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ঘটনার পটভূমি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অহিংস প্রতিবাদ দমাতে সরকারি বাহিনী নজিরবিহীন হিংস্রতা ছড়িয়ে দেয়। আন্দোলন রূপ নেয় অগ্নিগর্ভ গণ-অভ্যুত্থানে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে সরকার একে একে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ, সান্ধ্য আইন অর্থাৎ কারফিউ জারি এবং টানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পসহ দেশের সার্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্য কার্যক্রম অচল হয়ে পড়লে ২১ জুলাই কারখানা বন্ধের ঘোষণা আসে। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত তড়িঘড়ি করে ২২ জুলাই গণভবনে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ডেকে পাঠান। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে আয়োজিত সেই সভায় দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীদের তোয়াক্কা না করে শীর্ষ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা উপস্থিত হন এবং সরকারের অবস্থানকে সর্বাত্মক সমর্থন জানান।
গণভবনের ওই বৈঠকে কোনো ধরনের যৌক্তিক সমাধান বা শান্তির পথ না খুঁজে ব্যবসায়ী নেতারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার মসনদে টিকিয়ে রাখতে তোষামোদির চরম পরাকাষ্ঠা দেখান। সভার শেষ বক্তা হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রধান আহমেদ আকবর সোবহান আন্দোলনকারীদের অশুভ শক্তি আখ্যা দিয়ে বলেন যে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং এমনকি মৃত্যুর পরেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে। তিনি বিদেশে অবস্থানরত তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক তৎপরতার তীব্র সমালোচনা করে আন্দোলনকারীদের কঠিন বিচারে সোপর্দ করার জোর দাবি জানান। তাছাড়া বিগত ১৪ বছরে নিজেদের ব্যবসায়িক উন্নতির ফিরতি হিসাব তুলে ধরে তিনি অন্যান্য ব্যবসায়ীদের ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানান এবং সরকার চাইলে টানা এক মাস ব্যবসা বন্ধ রাখতেও আপত্তি নেই বলে ঘোষণা দেন।
অনুরূপভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরাও ওই দিন শেখ হাসিনার হাত শক্তিশালী করার শপথ নেন। এফবিসিসিআইয়ের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার তিন কোটি ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিত্বের দোহাই দিয়ে দাবি করেন যে, দেশের ব্যবসায়ী সমাজ কেবল শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশকে দেখতে চায় এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে তারা মেনে নেবে না। একই সুরে সুর মিলিয়ে বিজিএমইএ নেতা ও আওয়ামী লীগ সংগঠক এসএম মান্নান কচি আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্ত’ আখ্যা দিয়ে প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে হলেও শেখ হাসিনার পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাছাড়া ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি-র তৎকালীন প্রধান নজরুল ইসলাম মজুমদার, দোকান মালিক সমিতির হেলাল উদ্দিন, বিকেএমইএ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাতেম, চামড়া খাতের নাসিম মঞ্জুর এবং প্রাণ-আরএফএল প্রধান আহসান খান চৌধুরী আন্দোলনকারীদের ওপর আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত চালিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ব্যবসায়ী নেতাদের এই নিঃশর্ত দাসত্ব ও প্রকাশ্য উসকানির পর আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তাণ্ডব চরম ও নজিরবিহীন রূপ ধারণ করে। একের পর এক বুলেটের আঘাতে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতা আত্মাহুতি দেন এবং হাজার হাজার মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। কিন্তু রাজপথের অদম্য প্রতিরোধের মুখে ব্যবসায়ীদের এই পূর্ণ সমর্থনের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, অর্থাৎ ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের এক অংশ আত্মগোপনে চলে যান কিংবা বিদেশে পাড়ি জমান। আর কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও একটা বড় অংশ বর্তমানে দেশে নিজেদের ভোল পাল্টে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তাঁদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে জুলাই বিপ্লবের মাহাত্ম্য খাটো করার চক্রান্তও চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যায় ইন্ধন ও সহায়তার অভিযোগে উক্ত বৈঠকে নেতৃত্ব দেওয়া ২৪ জন শীর্ষ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই তালিকায় বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, এস আলম, নাসা, হা-মীম, মেঘনা ও ওরিয়নসহ দেশের প্রভাবশালী বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর মালিক ও তৎকালীন বাণিজ্য নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর অফিস সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার অধীনে চূড়ান্ত তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়া মাত্রই অভিযুক্ত এসব ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
তথ্যসূত্র: আমার দেশ