বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন

অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁস: নৈতিক স্খলনে পদ হারাতে পারেন গাজী নজরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সাথে বিতর্কিত ও আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর গুরুতর নৈতিক ও আইনি সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং নিজের অবস্থান রক্ষা করতে ওই তরুণীকে পরবর্তীতে নিজের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ হিসেবে দাবি করলেও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে তা দেশের প্রচলিত পারিবারিক আইনের কোনো শর্তই পূরণ করে না। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী প্রথমা স্ত্রীর উপস্থিতিতে এবং সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া সম্পন্ন করা এই বৈবাহিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি বেআইনি। একজন আইনপ্রণেতা হয়েও সরকারের সংবিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া অমান্য করা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ বিষয়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালানোর অভিযোগে এখন তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণার উপক্রম হয়েছে। কোনো জনপ্রতিনিধির এমন নৈতিক স্খলন ও বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হলে তাকে সংসদ পদ থেকে বরখাস্ত করার আইনি ভিত্তি রয়েছে বলে হুঁশিয়ার করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে এক তরুণীর সাথে হোটেলে কাটানো কিছু গোপনীয় ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। প্রাথমিক অবস্থায় ওই সংসদ সদস্যের সমর্থকেরা পুরো বিষয়টিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তির তৈরি ভুয়া ভিডিও বলে দাবি করে উড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। তবে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে ও তীব্র জনরোষের মুখে ওই আইনপ্রণেতা নিজের ফেসবুকে মুখ খুলতে বাধ্য হন। তিনি ভিডিওর ওই তরুণীর অস্তিত্ব স্বীকার করে দাবি করেন যে, চলতি বছরের ১৭ জুন তিনি ওই মেয়েকে বিয়ে করেছেন। পরবর্তীতে নজরুলের প্রথমা স্ত্রী, কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার পরিবারও এই একই সুরে কথা বলতে থাকেন। কিন্তু স্থানীয় গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের তথ্যমতে, দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়ে আইনানুযায়ী ইউপি চেয়ারম্যান বা সালিসি পরিষদে এমপি কোনো আবেদনই জমা দেননি। এমনকি বিয়ের রেজিস্ট্রি করা কাজী সালিসি পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই প্রথমা স্ত্রীর উপস্থিতির অজুহাতে সই করেছেন, যা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে কোনোভাবেই আইনি ছাড়পত্রের বিকল্প হতে পারে না।

ঘটনার তদন্ত ও ফাঁস হওয়া একাধিক দীর্ঘ ভিডিও পর্যালোচনায় এই কেলেঙ্কারির নানা চাঞ্চল্যকর ও অপরাধমূলক দিক উন্মোচিত হয়েছে। প্রায় ছয় মিনিটের একটি দীর্ঘ ফুটেজে দেখা যায় যে, প্রত্যক্ষদর্শীরা জোরপূর্বক কক্ষের দরজা খোলার পর এমপি কাজী নজরুলকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। সেখানে নিজের ভুল স্বীকার করে এবং নিজেকে সাতক্ষীরার জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি অনুনয়-বিনয় করে বিষয়টি গোপনে সামাজিকভাবে রফা করার প্রস্তাব দেন। ঘরের ভেতরে থাকা লোকজন অভিযোগ তোলেন যে, ওই তরুণীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হোটেলে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং ভিডিওর শেষাংশে মেয়েটির বয়স মাত্র ১৩ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বলে উল্লেখ করতে শোনা যায়। এমনকি প্রথমে যুবতীটি এমপিকে নিজের ‘দাদা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরক্ষণেই এমপি স্বীকার করেন যে তিনি তার ড্রাইভারকে দিয়ে ঘরটি ভাড়া করিয়েছিলেন এবং সেখানে ভুলবশত এসেছিলেন।

আইনি জটিলতার পাশাপাশি ওই তরুণীর বায়োডাটা এবং কথিত কাবিননামায় নানা অসংগতি ধরা পড়ায় সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক জীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। যুবতীটির জীবনবৃত্তান্তে গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে সংসদ সদস্য নিজে চাকরির জন্য ‘জোর সুপারিশ’ করলেও সেখানে মেয়েটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা ছিল। এছাড়া জীবনবৃত্তান্তে দেওয়া এমপির সইয়ের সঙ্গে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামার বর হিসেবে দেওয়া সইয়ের স্পষ্ট গরমিল লক্ষ্য করেছেন অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষকরা। নিজের ওপর আসা চাপ অন্য খাতে ঘোরাতে পরবর্তীতে ওই সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন যে, ঢাকার মগবাজারে শ্বশুরবাড়িতে তাকে এবং তার দুই স্ত্রীকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছিল। তবে পুলিশ জানায় যে, অতীতে সাধারণ একটি গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায়ও থানায় লিখিত দরখাস্ত দেওয়া এই সংসদ সদস্য এত বড় জিম্মি বা চাঁদাবাজির বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আজ পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক লিখিত অভিযোগ জমা দেননি।

সুশাসনের স্বার্থে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মতে, ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় হলেও জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি পদক্ষেপে আইনকানুন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। দেশের প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে কেউ বিয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের অপব্যবহার করলে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে সত্য গোপন করতে চাইলে তার আইনি মাশুল দিতেই হবে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী সালিসি পরিষদের তোয়াক্কা না করে পুনর্বিবাহ করলে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও নৈতিক মানদণ্ড বিসর্জনের কারণে গাজী নজরুল ইসলামের পদে বহাল থাকা নিয়ে এখন সর্বমহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ নিশ্চিত হলে জাতীয় সংসদ তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

 

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...