আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনলাইন কেনাকাটা, বিনোদন ও অফিশিয়াল কাজ সামলাতে দেশের ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে ডিজিটাল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিক দূরত্ব মুছে দিয়ে মুহূর্তেই তথ্য আদান-প্রদানের এই যুগে বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় ১৩,০০০ জিবিপিএস (গিগাবিটস পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হচ্ছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে মোবাইল ডাটা ব্যবহারের মাধ্যমে। তবে গত বছরে গ্রাহক নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের তরফ থেকে এক জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সিম নিবন্ধনের সীমা ১৫টি থেকে কমিয়ে ১০টিতে নির্ধারণের পর মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যায় বড় ধরনের পতন ঘটে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র আট মাসের ব্যবধানে দেশের চার মোবাইল অপারেটর প্রায় ৮০ লাখ ডাটা গ্রাহক হারায়, যার ফলে মোট গ্রাহকসংখ্যা ১২ কোটি ১৫ লাখ থেকে কমে ১১ কোটি ৩৫ লাখে নেমে আসে।
সিম নিবন্ধনের এই আইনি কড়াকড়ির প্রভাবে তৈরি হওয়া গ্রাহক ঘাটতি সামাল দিতে পরবর্তীতে কৌশলগত পদক্ষেপে জোর দেয় দেশের মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো। নতুন সিম বিক্রি বাড়াতে এবং পুরোনো ব্যবহারকারীদের ডাটা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে বাজারের অপারেটরগুলো ফ্রি ডাটা ও আকর্ষণীয় ইন্টারনেটের নানা প্রমোশনাল অফার নিয়ে মাঠে নামে। মূলত ‘ইন্টারনেট রেডি সিম’ বাজারজাতকরণ এবং সংযোগ নিলেই তাৎক্ষণিক ফ্রী মেগাবাইট বা গিগাবাইট দেওয়ার এই নতুন বিপণন কৌশলের কারণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। এর ফলে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসের ব্যবধানে দেশের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং প্রায় ৭৩ লাখ নতুন ও পুনর্ব্যবহৃত ডাটা গ্রাহক সংযোগে যুক্ত হয়েছে।
গ্রাহক সংখ্যা পুনর্দখলের এই প্রক্রিয়ায় মোবাইল অপারেটরগুলোর আর্থিক সূচক ও রাজস্ব আয়ে দৃশ্যমান প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর রবি আজিয়াটার মোট আয় বা রাজস্ব ৫,২৪২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭.১ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে কেবল ডাটা বা ইন্টারনেট বিক্রি থেকে কোম্পানিটির রাজস্ব আয়ে ১৩.৬ শতাংশের বিশাল প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। যদিও বাংলালিংক ও সরকারি অপারেটর টেলিটক তাদের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি, তবে টেলিকম খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন গ্রাহক বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের এই চাঙ্গা ভাব নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
তবে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক ও অপারেটরদের আয় বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধছে। গ্রাহকদের মূল অভিযোগ হলো ইন্টারনেট সেবার নিম্নমান, অপর্যাপ্ত গতি এবং প্যাকেজের অসংগতিপূর্ণ মূল্য বৃদ্ধি। ডাটা ব্যবহারকারীরা জানান যে, সরকার টেলিকম খাতে বিভিন্ন সময়ে ট্যাক্স ও ভ্যাট কমানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তার সুফল সাধারণ গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছায়নি। পূর্বে ১৯৯ টাকায় মিলতে থাকা ১৫ জিবির মতো সুবিধাজনক মেয়াদের প্যাকেজগুলো বর্তমানে ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া স্বল্পমূল্যের দীর্ঘমেয়াদী ১ জিবির প্যাকেজগুলো বন্ধ করে চড়া দামে কম মেয়াদের (যেমন ৩ দিন) ডাটা প্যাক কিনতে বাধ্য করায় গ্রাহকরা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন এবং এটিকে সেবার নামে এক ধরনের প্রতারণা বলে অভিহিত করছেন।
অন্যদিকে কেবলভিত্তিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খাতে কোনো নেতিবাচক ধাক্কা ছাড়াই গ্রাহক বৃদ্ধির স্বাভাবিক গতিধারা অব্যাহত রয়েছে। দেশের ব্রডব্যান্ড খাতে বর্তমানে দেড় কোটিরও বেশি সক্রিয় গ্রাহক নিয়মিত উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা উপভোগ করছেন। ঘরের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ, নির্দিষ্ট মাসিক ফি এবং আনলিমিটেড ব্যবহারের সুযোগ থাকায় অনেক ব্যবহারকারীই মোবাইল ডাটার পাশাপাশি ফাইবার অপটিক ব্রডব্যান্ড সংযোগের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের সার্বিক ডিজিটাল রূপান্তর বজায় রাখতে হলে কেবল প্রমোশনাল অফার দিয়ে কৃত্রিমভাবে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে মোবাইল ইন্টারনেটের মূল্যসীমা পুনর্নির্ধারণ করা এবং সেবার মান (QoS) নিশ্চিত করা অপরিহার্য।