শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন

শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল-শিবির সংঘাত: নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের শঙ্কা বিশ্লেষকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হঠাৎ করেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সহিংসতা ছড়ানোর ঘটনায় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির পরস্পরকে দায়ী করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে শুরু করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক লড়াইয়ে যে দুটি ছাত্রসংগঠন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তাদের এই মুখোমুখি অবস্থান ও পাল্টাপাল্টি প্রতিহতের হুমকি নতুন করে শিক্ষাঙ্গনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের এই মুখোমুখি সংঘাতের পেছনে মূল উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে সুবিধাবাদী কোনো ‘তৃতীয় পক্ষ’। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির যত বেশি পারস্পরিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে, চক্রান্তকারী সেই তৃতীয় পক্ষের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করা ততটাই সহজ হবে। তাই অবিলম্বে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের অভিভাবকতুল্য হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শুরু করে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসগুলোতে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয়ী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনে এক রাজপথের মিত্রদের মধ্যে এমন অপ্রত্যাশিত শত্রুতা ও বিশৃঙ্খলা দেখে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ ও বিস্ময় ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘর্ষের প্রতিটি ঘটনার পর দুই পক্ষ থেকেই উসকানি দেওয়া হলে তা কঠোরভাবে প্রতিরোধের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ শিক্ষার পরিবেশকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সংঘাতের দায় পুরোপুরি অস্বীকার করে ইসলামী ছাত্রশিবির দাবি করেছে যে, শিক্ষাঙ্গনে চলমান এই বিশৃঙ্খলার পেছনে তাদের কোনো ভূমিকা নেই; বরং ছাত্রদল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে দেশবাসীর মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসগুলোকে রক্তাক্ত করা হচ্ছে। একই সাথে গণমাধ্যমে এই সংঘাতকে ভুলভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি জানান, তারা ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চান; তবে কেউ যদি ইচ্ছে করে তাদের ওপর হামলা চালাতে আসে, তবে সংঘাতের উপযুক্ত জবাব দিতে বাধ্য হবেন তারা।
বিপরীতে ছাত্রদল অভিযোগটিকে উসকানিমূলক মন্তব্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্ক্ষিত ‘মব’ বা জনরোষের পরিস্থিতি তৈরি করে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ছাত্রদল প্রতিহত করেছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান যে, ক্যাম্পাসগুলোতে কোনোভাবেই শিবিরের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। জামায়াতের নেতাকর্মীদের ডেকে এনে ক্যাম্পাসের বাইরে ঝামেলা তৈরির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন যে, বিগত স্বৈরাচারের আমলে চরম নির্যাতন সহ্য করে রাজপথে টিকে থাকা ছাত্রদল কোনোভাবেই নীরব দর্শক থাকবে না। শিবির যদি আবারও হুমকি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তবে ছাত্রদল যেকোনো মূল্যে তা শক্ত হাতে মোকাবেলা করবে।
শিক্ষাঙ্গনের এই ক্রমাগত উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে ন্যূনতম পারস্পরিক যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক থাকা অপরিহার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, ক্যাম্পাসগুলোতে এই রাজনৈতিক সহিংসতা যদি এখনই থামানো না যায়, তবে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের জাতীয় সংকটের জন্ম দেবে। এতে মূল লড়াইয়ের বাইরে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত তৃতীয় পক্ষ নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পাবে, যা পরবর্তীতে সামাল দেওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভব হবে না।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বকে অবিলম্বে আলোচনায় বসার পরামর্শ দিচ্ছেন। অভিভাবক সংগঠনগুলোর কার্যকর হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছাড়া ক্যাম্পাসগুলোতে প্রগতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের সদিচ্ছা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল শিক্ষাঙ্গন থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সঘাত দূর করা সম্ভব, অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদী হুমকির মুখে পড়বে।
তথ্যসূত্র: সময় খবর


এ জাতীয় আরো খবর...