জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের গৌরবময় ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী বহর সম্প্রসারণের পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের নানা জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনার অবসান ঘটিয়ে চলতি মাসেই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুটি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ পৃথক দুটি মেগা ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। এই দ্বিমুখী চুক্তির মাধ্যমে বিমানের বর্তমান বহরে নতুন করে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরো ২১টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ, যার মধ্যে থাকছে ১১টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত বিশ্বস্ত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই চুক্তিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বিমানের ভবিষ্যৎ বহরের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি বিশাল চুক্তি সম্পন্ন করেছিল বিমান। নতুন প্রস্তাবিত এই ২১টি উড়োজাহাজ সেই পূর্ববর্তী চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৩৫টিতে। এই বিশাল বহরের মধ্যে ২৫টি হবে বোয়িং কোম্পানির এবং ১০টি হবে এয়ারবাসের। বর্তমানে বিমানের নিজস্ব বহরে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ সচল রয়েছে। এত ছোট একটি বহর নিয়ে পরিচালিত হওয়া একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার জন্য একসঙ্গে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেওয়া একটি অবিশ্বাস্য এবং বিপুল মাত্রার সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এয়ারবাসের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তির প্যাকেজটি বিমানের আধুনিকায়নে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। এই প্যাকেজের অধীনে চারটি এ৩৫০-৯০০ মডেলের ওয়াইডবডি বা প্রশস্ত আকারের উড়োজাহাজ এবং ছয়টি এ৩২১নিও মডেলের ন্যারোবডি বা মাঝারি আকারের জেট উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, এয়ারবাসের এই প্রস্তাবিত ক্রয়ের বিষয়ে বিমানের নিজস্ব টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটি গত ৩১ আগস্টের মধ্যেই তাদের যাবতীয় কাজ শেষ করে বিমান পরিচালনা পর্ষদের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে বোর্ডের একটি বিশেষ উপকমিটিও তাদের নিজস্ব পর্যালোচনা সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। এখন প্রস্তাবিত চুক্তিটি চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে একেবারে শেষ মুহূর্তের পর্যালোচনা চলছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে এক বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। এই বৈঠকে তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আধুনিকায়নে এয়ারবাস ক্রয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের এভিয়েশন ও হসপিটালিটি খাতের বিপুল সম্ভাবনাময় বিকাশে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগকারীরা প্রবলভাবে আগ্রহী এবং বাংলাদেশ সরকারের একটি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব প্রতিষ্ঠার এই স্বপ্নযাত্রায় যুক্তরাজ্য সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। বিমানের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, খুব শিগগিরই তারিখ চূড়ান্ত করে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এয়ারবাসের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে।
অন্যদিকে, বোয়িং সংক্রান্ত নতুন আলোচনা বিমানের এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে আরো রহস্যময় এবং বৃহৎ রূপ দান করেছে। গত এপ্রিলে স্বাক্ষরিত চুক্তির অধীনে যে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ আসার কথা রয়েছে, তার মধ্যে আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত। এগুলো ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনা অনুযায়ী, এখন আরো ১১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি নিবিড় বিবেচনার অধীনে রয়েছে। মূলত বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য আলোচনার সময় একসঙ্গে ২৫টি বোয়িং কেনার বিষয়ে প্রবল আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে প্রাথমিকভাবে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন বিমান যখন এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই বোয়িংয়ের বাকি ১১টি উড়োজাহাজের আলোচনা পুনরায় জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এই অতিরিক্ত বোয়িং কেনার খবরটি ঢাকার কোনো সূত্র থেকে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন থেকে প্রথম জনসমক্ষে আসে। গত ৩০ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর দাবি করেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি অসাধারণ চুক্তিতে পৌঁছেছেন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে বোয়িংয়ের প্রাথমিক অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা বা ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য দেননি, তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং হুমায়ুন কবিরের পরবর্তী মন্তব্যগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, আরো উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আলোচনা চলমান রয়েছে।
বিমানের বর্তমান বহরে থাকা ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে পাঁচটি টার্বোপ্রপ এবং ১৪টি মূল জেট উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি ওয়াইডবডি এবং চারটি ন্যারোবডি। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরনো উড়োজাহাজগুলোকে পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরে মোট ৪৭টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ঠিক কেন ২৫টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাসের একটি মিশ্র বহর বিমানের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হলো, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। এই বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কোন কোন আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত হবে, যাত্রী ও রাজস্ব বৃদ্ধির কোন নির্দিষ্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই মহাপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে এবং এর অর্থায়নের সঠিক কৌশল কী হবে, সে বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বা একত্রিত ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। চুক্তির শত শত কোটি ডলার নিজস্ব তহবিল, বাণিজ্যিক ঋণ, নির্মাতাদের অর্থায়ন নাকি সরকারি গ্যারান্টির মাধ্যমে মেটানো হবে, তা এখনো পুরোপুরি অস্পষ্ট। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যদি প্রতিযোগিতামূলক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চালু হয়, তবে বিমানের একক আয়ের একটি বড় অংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নতুন উড়োজাহাজের বিশাল ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এভিয়েশন খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষকরা এই বিশাল সম্প্রসারণকে একদিকে যেমন সম্ভাবনাময় বলছেন, অন্যদিকে তেমনি এর পেছনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েও কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। বিশিষ্ট এভিয়েশন বিশ্লেষক এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন মার্কেট যেভাবে দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাতে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থার সামনে বিপুল সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই কোটি প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করলেও বিমানের মার্কেট শেয়ার মাত্র ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এই বিশাল বাজার ধরতে হলে অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার অর্জন করা প্রয়োজন, যার জন্য উড়োজাহাজের সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, বিমানকে তাদের চিরাচরিত ও সেকেলে বিপণন কৌশল থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যদিকে, বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, উড়োজাহাজ কিনে বহর বড় করার চেয়েও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই বহরকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করা। ৪৭টি উড়োজাহাজ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হলে বিমানের প্রয়োজন হবে একটি অনেক বড় রুট নেটওয়ার্ক, বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত পাইলট, কেবিন ক্রু, দক্ষ প্রকৌশলী এবং বিশ্বমানের রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা। বিমানের বর্তমান দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট এবং আর্থিক সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া এত বড় বহর তৈরি করা ভবিষ্যতে সংস্থাটির জন্য এক বিশাল বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।