বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন

প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বহুমুখী মত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজে যে ব্যাপক গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, গত দুই বছরে সেই অঙ্গীকার থেকে ক্ষমতাসীন সরকার অনেকটাই পিছু হটেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা এখনো চরম দুর্বল রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, নিছক নির্বাচন হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও আইনি সংস্কারের লক্ষ্যে যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তার একটি বড় অংশ নির্বাচিত সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় ইতিমধ্যে তামাদি হয়ে গেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, গণতন্ত্রের জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; এর জন্য মৌলিক অধিকার রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন অপরিহার্য। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদের মূল দায়িত্ব ছিল নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি রাখা, যার একটি কার্যকর উপায় ছিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া; কিন্তু সরকার সেই মৌলিক নীতি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিনও মনে করেন, জুলাই সনদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত করা, যা না করায় জনমনে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।
বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষক ও বিরোধী দলের নেতারা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এবং স্বাধীনভাবে রায় দেওয়ার কারণে বিচারকদের পদোন্নতি বঞ্চনা ও বদলিসহ নানা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হচ্ছে। এনসিপি সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম জানান, সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দলীয় নিয়োগের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য হলেও বাস্তবে নির্বাচন কমিশন, দুদক ও পিএসসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার কাঠামো এবং পুলিশ প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়েও তীব্র সমালোচনা উঠেছে। বর্তমানে সরকার স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান না করে দলীয় অনুগতদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছে, যার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না জানান, নির্বাহী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানোর প্রস্তাবগুলো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার মানসিকতার কারণেই আটকে আছে। অধ্যাপক মহিউদ্দিনের মতে, পুলিশ বাহিনী এখনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি, অথচ পুলিশ সংস্কার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরাজনীতিকরণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে সবচেয়ে জরুরি ছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মনি। তিনি দাবি করেন, সরকার কোনো বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছে না কিংবা কোনো স্বেচ্ছাচারী আটকাদেশ দিচ্ছে না। তাঁর মতে, গত পাঁচ দশক ধরে দেশে পুলিশ, বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মতো স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি, তাই রাতারাতি সব ঠিক করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, পুরো সংবিধান নতুন করে লেখার চেয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে সংস্কার আনাটাই বাস্তবসম্মত এবং সরকার বিদ্যমান জনবল দিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ফেরাতে কাজ করছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইপ জানান, জনগণ ও সাংবাদিকরা এখন নির্বাহী বিভাগের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিনা বাধায় সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নাগরিকদের তাঁর সরকারের সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে বাস্তবে এই চিত্র ভিন্ন বলে দাবি করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সম্প্রতি এ ধরনের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, সমালোচনামূলক পোস্টের কারণে সাধারণ নাগরিকদের আটক করার এই পদক্ষেপ মূলত পূর্ববর্তী সরকারের দমনমূলক নীতিরই এক উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা।
তথ্যসূত্র: নিউএজ


এ জাতীয় আরো খবর...