শিরোনামঃ
অতিরিক্ত বাসভাড়া নিলে জরিমানা, বাতিল হবে রুট পারমিট: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী সরকারি হাসপাতালের সামনে কোনো ক্লিনিকের অনুমোদন দেওয়া হবে না বিরোধী দলগুলো আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে: রিজভী দূরপাল্লা ও মহানগরে বাসভাড়া বাড়ল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সীমিত সম্পদের ভারসাম্য রক্ষায় জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত : তথ্য উপদেষ্টা বাস্তবসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানে বিশেষ জোর দেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির বিমার টাকা হাতাতে নিজেদের বাসেই আগুন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ চক্র চাকরির চূড়া থেকে নামার প্রস্তুতি ফিফা সংস্কারের প্রস্তাব ইনফান্তিনোর
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন

চাকরির চূড়া থেকে নামার প্রস্তুতি

বাদল সৈয়দ / ৬ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

১) ইন্দ্রপুরীতে এক সন্ধ্যা…
তখন আমি চট্টগ্রামে কর্মরত।
একটি ক্যাডার সার্ভিসের বার্ষিক ডিনারে দাওয়াত পেলাম। তাতে প্রধান অতিথি ছিলেন সে সার্ভিসের প্রধান।
তিনি ঢাকা থেকে আসবেন। রাস্তায় দেখলাম, তাঁকে স্বাগত জানিয়ে ব্যানার টাঙানো হয়েছে! আমি খুবই অবাক হলাম!
সরকারি চাকরিজীবীকে স্বাগত জানিয়ে এ রকম ব্যানার আগে কখনো দেখিনি!
যাই হোক, সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে খোলা মাঠে। সেটিকে ইন্দ্রপুরী বানিয়ে ফেলেছে! নওয়াবী স্টাইলে গেট সাজানো হয়েছে। নার্সারি থেকে শত শত ফুলগাছ আনা হয়েছে। সেগুলোর উপর আলো ফেলে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে। স্টেজ দেখে মনে হচ্ছে, মুঘল আমলে দরবার—সেখানে সিংহাসন। প্রধান অতিথির জন্য।
ইচ্ছে ছিল প্রধান অতিথির সাথে কথা বলব। আমরা যখন চাকরিতে জয়েন করেছিলাম, তখন তিনি আমাদের ট্রেনিং একাডেমিতে মাঝে মাঝে অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতেন—আমাকে বেশ পছন্দ করতেন।
কথা বলা হলো না। তাঁকে ঘিরে অনেক ভিড়। সবাই তাঁর মনোযোগ পাওয়ার জন্য খুব ব্যস্ত।
ভিড়বাট্টা এড়িয়ে ডিনার শেষে বাড়ি ফিরে এলাম।
২) কোথাও কেউ নেই…
বছর দুয়েক পর।
আমি তখন সিলেটে। হঠাৎ একদিন সেই প্রধান অতিথির ফোন পেলাম। তিনি তখন অবসরে গেছেন।
আমাকে বললেন, ‘কাল আমার ছেলের বিয়ে। কনে সিলেটের, তাই এখানে অনুষ্ঠান হচ্ছে। শুনলাম, তোমার পোস্টিং এখানে—তাই দাওয়াত দিতে ফোন করলাম। ডিটেইল তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাচ্ছি। এলে খুব খুশি হবো।’
পরদিন আমি তাঁর ছেলের বিয়েতে গেলাম এবং আবিষ্কার করলাম ‘কোথাও কেউ নেই!’
বছর দুয়েক আগে যার জন্য রাস্তায় ব্যানার টানানো হয়েছিল, ইন্দ্রপুরী বানানো হয়েছিল, মুঘল দরবারের স্টাইলে মঞ্চ বানানো হয়েছিল, সিংহাসন সাজানো হয়েছিল, তিনি একা একা ছেলের বিয়ে সামলাচ্ছেন!
যে ব্যাপারটি সবচেয়ে অবাক করল, তা হচ্ছে, অনুষ্ঠানে তাঁর সার্ভিসের কেউ নেই! অথচ সিলেটে সম্ভবত সে দপ্তরের লোকজন সবচেয়ে বেশি!
৩) অবসর—থাকে না কেউ দুদণ্ড ভালবাসিবার…
অনেক চাকরিজীবীর অবসরপরবর্তী জীবনে কোথাও কেউ থাকে না।
ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রবল জনবেষ্টিত থেকে তাঁরা বুঝতেই পারেন না আসলে তাঁরা কত একা!
রিটায়ার করার পর এতদিনের পরিচিত জগত, সে জগতের মানুষ, সুবিধা, সব মুহূর্তে নেই হয়ে যায়। এটাই বাস্তবতা।
আমি আমার কয়েকজন পরিচিতকে অবসরের পর এ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে দেখেছি।
তাই চাকরিতে ঢোকার পর প্রথম দিন থেকেই আমার মাথায় ছিল, একদিন আমাকে অবসরে যেতে হবে। সে জীবন কীভাবে কাটাব?
সেজন্য আমি তখন থেকেই কিছু পরিকল্পনা করেছিলাম।
ক। আমি জানতাম, কর্মব্যস্ত জীবন ছেড়ে আমাকে পরিবারের কাছেই ফিরে যেতে হবে। তারাই হবে আমার প্রধান আশ্রয়।
তাই আমি শুধু নিজ পরিবার নয়, বর্ধিত পরিবারের সাথেও সারাজীবন খুব ঘনিষ্ঠ থেকেছি। তাদের সাথে আড্ডা-হাসিতে সময় কাটিয়েছি, বেদনা ভাগ করে নিয়েছি।
খ। আমি একদিনের জন্যও আমার বাল্যবন্ধুদের সঙ্গ ছাড়িনি। কারণ আমি জানি, এরা আমাকে কখনোই ছেড়ে যাবে না। হোক তা চাকরি কিংবা অবসর জীবন।
ছোটবেলা থেকে একসাথে খেলাধুলা, মারামারি, প্রেমের চিঠি নিয়ে কাড়াকাড়ি, আমাদের মধ্যে যে বন্ধন গড়ে তুলেছে তা অচ্ছেদ্য। এই বন্ধন ছিন্ন করলে এক সময় আমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাব।
তাই আমি তাদের সঙ্গেই বড় হয়েছি—তাদের সঙ্গেই বুড়ো হয়েছি।
গ। অপ্রিয় সত্য হলো, বয়সের কারণে এক সময় হয়তো আমি হারিয়ে যাব। অথবা আমার বাল্যবন্ধুরা হারিয়ে যাবে। তারা যদি আমার আগে চলে যায়, তখন যাতে আমি নিঃসঙ্গ না থাকি সেজন্য তরুণদের সাথে প্রচুর মিশেছি। বন্ধুত্ব করেছি। আমার ধারণা, অবসরের পর এরাও আমার খুব বড় শান্তির জায়গা হবে।
ঘ। শুধু পরিবার বা বন্ধু নয়, আমি নিজের আলাদা একটি জগতও তৈরি করেছি। পড়া, লেখালেখি, আর কিছু সামাজিক কাজ নিয়ে সে জগত।
বলা যায়, একইসাথে আমি দুটো প্যারালাল জীবন যাপন করেছি। সৈয়দ মোহাম্মাদ আবু দাউদ নামে পেশাজীবন—বাদল সৈয়দ নামে পাঠক, লেখক ও ক্ষুদ্র সামাজিক কর্মী জীবন।
দুটো জীবন পুরোই আলাদা—নামও আলাদা।
প্রথম জীবনের অবসর আছে, দ্বিতীয় জীবনের অবসর নেই।
ঙ। আমি খুব চিন্তাভাবনা করেই চাকরির বিভিন্ন সুবিধা, বাড়ি, গাড়ি, ফোন, প্রটোকল এগুলো খুব কম ব্যবহার করেছি। কোনো কোনোটা একেবারেই করিনি। পরিবারকেও করতে দিইনি। যাতে অবসরের পর এগুলো হারানোর আফসোস আমাকে স্পর্শ না করে।
উচ্চপদস্থরা রিটায়ার করার পর যে ব্যাপারগুলো সবচেয়ে বেশি আঘাত করে, তার মধ্যে এগুলো হারানোর বেদনা অন্যতম।
আমি জানি না, আমার এ কৌশলগুলো কাজ করবে কি না। এখনো চাকরি করছি, অবসরে গেলে বোঝা যাবে এগুলো কতটুকু কার্যকর। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এগুলো কাজ না করার কোনো কারণ নেই।
সেই বিশ্বাস থেকে, এমনকি আজ যিনি চাকরি শুরু করেছেন, আমি তাঁকেও বলব, আমার কথাগুলো নিয়ে ভাবতে—কারণ অনন্তকাল আপনি চাকরি করবেন না। একদিন না একদিন অবসরে যেতে হবে।
এভারেস্ট বিজয়ীরাও চূড়ায় বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না—তাঁদের নিচে নেমে আসতে হয়। অনেকে বলেন সেখানে ওঠার চাইতে নেমে আসা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
একদিন আপনাকেও চাকরির চূড়া থেকে নেমে আসতে হবে। তাই নেমে আসার ঝুঁকি সামলানোর পরিকল্পনা এখন থেকে করুন।
সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনা হলো, খুব সাধারণ থাকা।
সাধারণ মানুষের অবসর নেই। তাদের হাজারটা কাজ থাকে।

#আসুন মায়া ছড়াই


এ জাতীয় আরো খবর...