সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন

জাতিসংঘ নিয়ে ইসরায়েলি ও আমেরিকানদের তীব্র অসন্তোষ: জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জাতিসংঘের কার্যক্ষমতা ও ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল অন্যতম। নতুন এক জরিপেে এমন তথ্য উঠে এসছে।

গ্যালপ-এর জরিপ অনুযায়ী, জাতিসংঘের ভূমিকাকে সবচেয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে ইসরায়েলিরা। দেশটিতে মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ সংস্থাটির কর্মকাণ্ড সমর্থন করে এবং তাদের নিট রেটিং দাঁড়িয়েছে মাইনাস ৬১ তে।

এমন এক সময়ে তথ্যগুলো সামনে এলো, যখন বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বিভাজন এবং জাতিসংঘ-বিরোধী মনোভাবাপন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে সংস্থাটি নানা সংকট, মানবিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে ইসরায়েল সরকার গাজায় যুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে বারবার তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে।

মে মাসে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘকে একটি “রাজনীতিকীকরণ করা ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা” হিসেবে বর্ণনা করে এবং কলা হয়, ‘ এটি তার প্রতিষ্ঠাকালীন মূলনীতি ত্যাগ করেছে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু বানোনোকেই তাদের প্রাথমিক মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছে।’

সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ভাষণ দেন ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।

উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘অধ্যুষিত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সহিংসতা, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং বসতি স্থাপন কার্যক্রম শান্তির পথকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং জাতিগত নিধনের ভয়াবহ শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।’

গ্যালপ-এর জরিপ থেকে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও একইভাবে জাতিসংঘের ওপর চরম অসন্তুষ্ট। বেশিরভাগ আমেরিকানই মনে করেন, জাতিসংঘের পাঁচটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্যের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা খুবই হতাশাজনক: মানবিক সহায়তা (৫৩ শতাংশ), উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা (৬৩ শতাংশ), মানবাধিকার রক্ষা (৭০ শতাংশ), আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা (৭০ শতাংশ) এবং শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা (৭৩ শতাংশ)।

নিজের প্রশাসনের তুলনায় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ অকার্যকর বলে বারবার মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার ভাষণে ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, ‘জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য কী? এটি তার সম্ভাবনার কাছাকাছি পৌঁছাতেও পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।’

গ্যালপ জানিয়েছে, ‘গত দুই দশক ধরে মার্কিনীরা সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘের অস্তিত্বকে সমর্থন করে আসলেও তারা মনে করে না যে উদ্ভূত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় এটি কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে।’

সংস্থাটি আরও জানায়, ‘সর্বশেষ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকান জাতিসংঘের কাজ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। শান্তি বজায় রাখার বাইরেও বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের অনেক ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু সেসব ক্ষেত্রেও আমেরিকানরা এর পারফরম্যান্সের প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই বেশি করে।’

তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে জাতিসংঘের ভাবমূর্তি অনেকটাই ইতিবাচক। সামগ্রিকভাবে এসব দেশে সংস্থাটির পারফরম্যান্স নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি স্পষ্ট। সেখানে জাতিসংঘের গড় গ্রহণযোগ্যতা হার ৫০ শতাংশ, এবং নিট গ্রহণযোগ্যতা স্কোর প্লাস ২৪।

গ্যালপ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে জাতিসংঘের প্রতি সবচেয়ে জোরালো আঞ্চলিক সমর্থন দেখা গেছে। এই অঞ্চলগুলোতে অসন্তুষ্টির তুলনায় সন্তুষ্টির হার যথাক্রমে ৫১ এবং ৪৩ পয়েন্ট বেশি।

বিশ্বের ৬৭টি দেশে শতকরা ৫০ ভাগের বেশি মানুষ জাতিসংঘের কার্যক্রমকে সমর্থন করেন। পক্ষান্তরে মাত্র ৯টি দেশ রয়েছে, যেখানে ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

গ্যালপ-এর বিশ্লেষক জুলি রে-এর মতে, ‘২০২৬ সালের ডিসেম্বরে বর্তমান মহাসচিব গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যিনি নতুন দায়িত্ব নেবেন, তিনি এমন এক সংস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পাবেন, যার প্রতি একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থন ও ইতিবাচক আস্থা রয়েছে, অন্যদিকে আবার এটি কীভাবে দেখা হচ্ছে তা নিয়ে চরম মতপার্থক্যও বিদ্যমান।’

তিনি আরও জানান, ‘এই মতপার্থক্য খোদ নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরেও বিস্তার লাভ করেছে। কিছু স্থানে নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে ওঠার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সংস্থাটির কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে পরিচিত করা এবং সঠিক ধারণা তৈরি করা। যেসব জায়গায় এখনো কোনো নির্দিষ্ট মতামত গড়ে ওঠেনি, সেখানে জাতিসংঘ মূলত কী কাজ করে এবং এর সুফল কী, তা তুলে ধরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।’


এ জাতীয় আরো খবর...