শিরোনামঃ
প্রশাসনে রদবদল: (৪ অক্টোবর-২২ অক্টোবর, ২০২৬ পর্যন্ত ) ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ মোকাবিলায় ভারতে মানুষ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপের সুযোগ নিয়ে শুরু হলো ম্যারিকো বাংলাদেশ ওভার দ্য ওয়াল পায়রা বন্দরে গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়ার কাছে খাদ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব সরকারের প্রস্তুতি আছে বলেই আইজিপি ক্রসফায়ারের কথা বলেছেন: আখতার ৩১ অক্টোবর লংমার্চ সফল করতে ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ পাঁচজনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ সাগর-রুনি হত্যা মামলায় জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ২০ জানুয়ারি ৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রীসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন

লটারির নামে লুকোচুরি ও কোটি টাকার বাণিজ্য: গণপূর্তে ফ্যাসিস্ট দোসরদের থাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রকৌশলী বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া এক বিশাল আর্থিক দুর্নীতি এবং গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জালে আবর্তিত হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। লটারি পদ্ধতির স্বচ্ছতার মুখোশ পরে মূলত পূর্বনির্ধারিত পদায়ন, গ্রেডিং শিট ম্যানিপুলেশন এবং বড় অংকের অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে এই পদের পুনর্বিন্যাস সম্পন্ন করা হয়েছে। জানা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে প্রায় একশ বিশ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে এক মারাত্মক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের সুবিধাভোগী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের দোসররা এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে রাষ্ট্রের অতি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তাসহ নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও অভিযোগ থেকে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নের জন্য এ প্লাস, এ, বি, সি এবং ডি—এই পাঁচটি আলাদা ক্যাটাগরি তৈরি করা হলেও এর কোনো লিখিত মানদণ্ড, সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতি কিংবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের নথিপত্র প্রকাশ্যে আনা হয়নি। অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন বাক্সে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার নাম আলাদা করে রেখে লটারির প্রক্রিয়াটিকে পুরোপুরি প্রভাবিত করা হয়েছে। ঢাকার চার থেকে পাঁচটি লাভজনক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য কর্মকর্তাদের নাম আগেই নির্ধারিত করে রাখা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো: জিয়াউর রহমান, আহসান হাবীব, রেজা তাইমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ এবং রাশেদ আহসানের মতো বিতর্কিত ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নাম ও ক্যাটাগরি নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়েছে।

লটারির পবিত্রতা রক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে গ্রেডিং শিট বা মূল্যায়ন তালিকায় নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের শীর্ষ পদগুলোতে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম অতীতে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন এবং প্রজেক্ট ডিভিশন-৫-এর মতো লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক ছাত্র এবং ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার পটভূমি থাকায় তার এই বারবার বিশেষ স্থানে পদায়ন কোনো সাধারণ কাকতালীয় ঘটনা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে, মো: জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর এবার সরাসরি সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসংলগ্ন শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর মতো অতি সংবেদনশীল এলাকায় পদায়ন পেয়েছেন। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ সংযুক্ত করা হয়েছে, যার অধীনে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জাদুঘরের মতো অতি স্পর্শকাতর কাজ রয়েছে।

মাত্র এক মাসের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে একযোগে বদলি করার ঘটনা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এই বিশাল বহরে ৭৬৭ জন সিভিল উপসহকারী প্রকৌশলী, ২৫৪ জন ইলেকট্রোমেকানিক্যাল উপসহকারী প্রকৌশলী, ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এমন একটি সময়ে এই রদবদল করা হয়েছে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে নানামুখী গুঞ্জন ও ষড়যন্ত্রের ডালপালা ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআই এবং দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্বে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না সচেতন মহল। পতিত রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান বা সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টায় এই প্রকৌশলীরা কোনো গোপন এজেন্ডার অংশ হয়ে উঠতে পারেন কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

এই বদলি ও পদায়ন সিন্ডিকেটের পেছনে অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী কার্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক এবং সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মিলে এই বিশাল অবৈধ বাণিজ্যের জাল বিস্তার করেছেন। এর পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম দোসর ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো: হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সীর ভায়রা ভাই আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে গণপূর্ত-১ এর দেখভাল করা এই কর্মকর্তা প্রাক্কলন অনুমোদন থেকে শুরু করে ই-জিপি টেন্ডারের টেক অনুমোদন ও ভেরিয়েশন সংক্রান্ত প্রতিটি ফাইলে পাঁচ শতাংশ হারে ঘুষ বা কমিশন দাবি করেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। ঠিকাদারদের ওপর এই জুলুম কেবল রাজধানী অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অতীতে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলেও ওটিএম পদ্ধতির দরপত্র অনুমোদনের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছে রাজিবুল ইসলামের নাম, যিনি মহাখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ অতীতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ দায়িত্ব পালনের পর আবারও একই সংবেদনশীল স্থানে পুনর্বহাল হয়েছেন। অন্যদিকে, রেজা তাইমুর মালিককে সরাসরি এনএসআই সদরদফতর, দুদক কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন সংশ্লিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে লটারির মাধ্যমে বিজয়ী দেখানো হয়েছে। তার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়—বিশেষ করে তার পিতা চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি থাকার বিষয়টি এই পদায়নের স্বচ্ছতাকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একইভাবে শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠভাজন রাশেদ আহসান ময়মনসিংহের পাট চুকিয়ে মিরপুর ও আজিমপুর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়েছেন। এসব পদের নেপথ্যে প্রায় একশ বিশ কোটি টাকার যে অবৈধ লেনদেনের গুঞ্জন রয়েছে, তার সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব, ট্যাক্স ফাইল ও নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এই ভয়াবহ সংকট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বাসভবন বা কার্যালয়ের মতো স্পর্শকাতর জায়গাগুলো যদি ফ্যাসিবাদী শক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট আমলা বা প্রকৌশলীদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কোনো কারণে দেশে পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে এই কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তাই অবিলম্বে এই পদায়ন প্রক্রিয়া বাতিল করে রাজনৈতিক বিতর্কমুক্ত ও পরীক্ষিত বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের এসব স্থানে পদায়ন করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মন্তব্য করেছেন যে এই ধরনের পরিকল্পিত পদায়ন ও নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক সংযোগ এবং পূর্বনির্ধারিত বোঝাপড়ার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে, যা খতিয়ে দেখা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই লটারি বাণিজ্য এবং স্পর্শকাতর স্থানে সুবিধাবাদী চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিচারিক তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্রধ মানবজমিন


এ জাতীয় আরো খবর...