সব কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে আমার প্রায় রাত নটা বেজে গেলো।
বাংলোয় দেখি পলিন নেই।
অবাক হয়ে কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিল, “মেমসাব, সাগরে ডুব দিতাছে।”
আমি দ্রুত বিচে গিয়ে দেখি মাঝ শুক্লপক্ষের দুর্বল চাঁদের আলোয় মেয়েটি পানিতে ভাসছে। ভঙ্গিতেই বোঝা যায় ওস্তাদ সাঁতারু।
দূরে দাঁড়িয়ে দুজন পুলিশ তার উপর চোখ রাখছে।
আমি চিৎকার করে ডাকলাম,”পলিন, উঠে এসো। এ জায়গাটায় সমুদ্র পুরো সেইফ না। চোরা গর্ত থাকতে পারে। প্লিজ—”
পলিন একবার হাত নেড়ে সাঁতরে দূরে চলে গেল, একটু পর ভাসতে ভাসতে আবার তীরে এসে ঠেকলো, এবার আমি জোর দিয়ে বললাম, প্লিজ উঠে এসো। ভোরে নামতে পারবে। তাছাড়া নতুন জায়গা, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
অপূর্ব এক জলপরির ভঙ্গিতে পানি মাড়িয়ে হেঁটে আসতে আসতে ও বললো,” আলাস্কায় স্কি করা আমার শখ। আর যাই হোক ঠান্ডা আমাকে কাবু করতে পারে না, বরং আমার চামড়ায় ধাক্কা খেয়ে নিজেই ঠান্ডা বাঁধায়। হাহাহাহা। চলো যাই, লেটস হ্যাভ ডিনার।”
মরা চাঁদের আলোয় তার চেহারায় আনন্দের আভা নাচছে। সে আভায় যেকোনো পুরুষ খুন হয়ে যেতে পারে।
বাংলোয় পৌঁছে পলিন রুম থেকে বেরুতে অনেকক্ষণ সময় নিলো। তারপর নিচে ডাইনিং এ এসে বলল, সরি, জেফরি ফোন করেছিল। এমন পাগল ছাড়তেই চায় না, তোমাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখলাম।”
আমি হেসে বললাম, “ইটস ওকে। আমার বরং বেচারার জন্যই খারাপ লাগছে। কোথায় বাগ্দত্তাকে নিয়ে ম্যানহাটনের ‘ফোর সিজন’এ ডিনার করবে তা না, বেচারা বাড়িতে একা সিলিং এর দিকে মন খারাপ করে তাকিয়ে আছে। হাহাহাহ।”
পলিন চোখ পাকিয়ে বললো, “ইউ নটি বয়। তোমার ওয়াইফও তাই করছে নিশ্চয়।”
আমি হাসতে হাসতে জবাব দিলাম, “বাড়িতে বাচ্চা সামলাতে সামলাতে ওর আমাকে মিস করার সময় পাবে না, বাট স্টিল উই ডু হ্যাভ ভেরি গুড কেমেস্ট্রি। হাহাহাহা।”
“তোমাদের এ ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগে।”
“কোন ব্যাপার?”
বন্ডেজের ব্যাপারটা। আমাদের ওখানে কতো ছোটোখাটো ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়। বিশ্বাস করতে পারো, শুধু শীতে বাড়িতে আটকা পড়ে ‘কেবিন ফিভার’ নামে তীব্র হতাশায় আক্রান্ত হয়ে অনেক বিয়ে ভেঙে যায়।”
“মাঝে মাঝে কী এ স্বাধীনতা ভালো না? ভালোবাসা উবে গেলে এক ছাদের নিচে থাকা কি কষ্টকর নয়?”
আমি স্যুপের বাটি টেনে নিতে নিতে বললাম।
“হয়তো কষ্টকর। কিন্তু আমার বাচ্চাদের জন্য খুব খারাপ লাগে। ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের অনেক বেদনার মধ্যে যেতে হয়। আমি নিজেই তার সাক্ষী। আমার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবা আলাদা হয়ে যান। তারপর কতো ঝামেলা। মা চাইল্ড কেয়ারের জন্য কেইস করলেন। কোর্টে ছোটাছুটি। কী অনিশ্চয়তা! ভেরি ড্যামেজিং ফর চাইল্ড সাইকোলজি।”
আমি তাড়াতাড়ি কথা ঘুরানোর জন্য বললাম , ইউ আর লুকিং ভেরি বিউটিফুল।”
“থ্যাংকস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট।”
ডিনার শেষে পলিন জিজ্ঞেস করলো, এখন কী করবে?
“ঘুমাবো, ক্লান্তিতে চোখ মুদে আসছে।”
“বলো কী! নাইট ইজ স্টিল ইয়াং। আমি বারান্দায় বসে সমুদ্রের ভাষা শুনবো। মাঝরাতে সমুদ্র অন্য ভাষায় কথা বলে। মনে হয় গান গাইছে।”
এ মেয়ে বলে কী! প্রায় ছাব্বিশ ঘণ্টা জার্নি করে বাংলাদেশে এসেছে। তারপর প্রায় দু ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে। এখন বলছে রাত জেগে সাগরের ভাষা শুনবে!
আমি বললাম,” না, সরি, আমাকে ঘুমাতে হবে। তুমি একাই যাও।”
“ওকে, তবে গ্যারান্টি দিচ্ছি এতো সুন্দর কোনো মেয়ের সাথে মধ্যরাতে সাগর তীরে বসে থাকার সুযোগ আর কখনো পাবে না।”
আমি হাসতে হাসতে দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম।
পরদিন ঘুম ভাঙলো সকাল আটটায়। সর্বনাশ! নটায় মিটিং! এর মধ্যে ফ্রেশ হওয়া, নাস্তা, সব করতে হবে! কোনোরকমে গোসল করে নিচে নামলাম। আমার টেনশন পলিন উঠেছে কি না? ও তো মাঝরাত অব্দি জেগেছিলো।