১) একবার এক বসের রুমে বসে আছি। কড়া মেজাজের জন্য তাঁকে সবাই ভয় পেত। তবে তাঁর একটি গুণ ছিল, তা হচ্ছে, শতভাগ সততা। একের পর হাজারটা শূন্য লাগিয়েও তাঁকে কেনা যেত না।
এমন সময় একজন বেশ নামকরা ভদ্রলোক রুমে ঢুকলেন। তিনি বারবার একটি কাজ করে দেওয়ার জন্য স্যারকে অনুরোধ করতে লাগলেন। স্যার বললেন, ‘এটা করা সম্ভব নয়। আইন পারমিট করে না।’
কথা না রাখায় অনুরোধকারী ভদ্রলোক খুব রেগে গেলেন। উঁচু কণ্ঠে বললেন, ‘আমাকে সারা দেশ চেনে, আর আপনি আমার অনুরোধ রাখবেন না?’
স্যার বললেন, ‘আপনার পরিচিতি আইন লঙ্ঘনের লাইসেন্স নয়।’
ভদ্রলোক আরও খেপে গিয়ে স্যারকে গালাগালি করতে লাগলেন। একপর্যায়ে তিনি সীমা ছাড়িয়ে গেলেন।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, অতি বদরাগী স্যার চুপ করে আছেন। অথচ তিনি খুবই ক্ষমতাবান মানুষ। যে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম, তা যত নামকরাই হোক।
রাগারাগি করে ভদ্রলোক চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার, আপনি ওনাকে কিছুই বললেন না?’
তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ‘দেশশুদ্ধ বদনাম আমি নাকি বদরাগী। কিন্তু আমি রাগারাগি করি সেনসিবল মানুষের সাথে। পাগলের সাথে নয়। পাগল ঢিল ছুড়লে তুমি কি পালটা ঢিল ছোড়ো?’
আমি শিখলাম, সবসময় সবার সাথে প্রতিক্রিয়া দেখাতে নেই।
২) আমার কয়েক বছরের বড় এক ভদ্রলোক আছেন। তাঁর অদ্ভুত একটি অভ্যাস আছে। তা হলো, অন্যকে ছোট করা। যেদিন আমার চাকরি হলো, সেদিন আমরা বন্ধুরা সে উপলক্ষে চায়ের দোকানে হুল্লোড় করছি। সবার হাতে হাতে সিঙ্গারা।
এমন সময় তিনি সেখানে এলেন। আমাকে বললেন, ‘তুমি নাকি বিসিএস পাস করছ? দূর! এইগুলা চাকরি নাকি? আমার ভাই বলছে আমেরিকা নিয়ে যাবে। সেইখানে খালি টাকা আর টাকা। তুমি তো মিয়া আমার এক জোড়া জুতোর দামের সমান বেতনও পাবা না।’
আমি তো রেগে টং। কারণ তিনি দুবার বিসিএস দিয়েছিলেন। পাস করেননি। আর আমাকে বলছেন এই কথা!
রেগেমেগে তাঁকে কিছু বলতে যাব, ঠিক তখন বন্ধু সালমান হাতে চাপ দিল। এর অর্থ হলো, ‘বাদ দে, কিছু বলিস না।’
পরে আমি সালমানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওই ফাজিল লোককে কিছু বলতে মানা করলি কেন?’
সালমান উত্তর দিল, ‘পাগলের সুখ মনে মনে। তাতে বাধা দিতে নেই।’
আমি একটি মূল্যবান শিক্ষা পেলাম। কেউ মনে মনে সুখ পেলে তাতে নাক গলাতে নেই।
৩) নতুন বিয়ে হয়েছে। বিয়েসূত্রে যে বাবা পেয়েছি, তাঁকে ‘আব্বু’ ডাকতাম। খুবই সজ্জন মানুষ।
একদিন তিনি তাঁর কন্যা ও আমাকে নিয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেন।
এ ধরনের অনুষ্ঠান হবে, কিন্তু দু-একজন চরম অবিবেচক মানুষ থাকবে না, তা হয় না।
আব্বু আমাকে সবার সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন। এমন সময় একজন বলে উঠলেন, ‘চৌধুরী সাহেব, কী ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিলেন! কালোর কালো। আপনার মেয়ের সাথে এই ছেলে যায়?’
অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি কিন্তু সত্য।
সঙ্গে সঙ্গে অপমানে আমার চোখে পানি চলে এলো। আব্বু আমার হাত শক্ত করে ধরলেন, তারপর জবাব দিলেন, ‘আমি গায়ের রং দেখে মেয়ে বিয়ে দেইনি। মাথা দেখে দিয়েছি। ভারে কাটার চেয়ে ধারে কাটা ভালো। ভারে কাটলে এবড়োখেবড়ো হয়, ধারে কাটলে হয় না।’
সেদিন আমি শিখলাম, ভার নয়, কাটার জন্য দরকার ধার। আর তীক্ষ্ণ মেধার চেয়ে ধারালো কিছু নেই। এ মেধা আমাকে অর্জন করতে হবে।
***
#আসুন মায়া ছড়াই