ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানের শাসনক্ষমতা নিয়ে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন টানাপোড়েন। একদিকে খামেনিপুত্র মোজতবা খামেনি নিজেকে উত্তরসূরি ঘোষণা করেছেন, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁর কাছে একটি ‘সংক্ষিপ্ত তালিকা’ বা শর্টলিস্ট রয়েছে। ওয়াশিংটন কি তবে তেহরানে একটি ‘পুতুল সরকার’ বসাতে যাচ্ছে?
পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে ভিডিও প্রতিবেদনে কয়েকটি নাম উঠে এসেছে, যাদের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করছে:
রেজা পাহলভি (সাবেক শাহজাদা): ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত। ট্রাম্পের তালিকায় তাঁর নাম সবার উপরে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানে রাজতন্ত্র ফেরানোর বা একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ার প্রচারণা চালাচ্ছেন। ১৯৬০ সালে তেহরানে জন্ম নেওয়া রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর দেশ ছাড়েন। তিনি নিজেকে ইরানের ‘ক্রাউন প্রিন্স’ দাবি করেন। তাঁর লক্ষ্য হলো ইরানে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা অথবা একটি রেফারেন্ডামের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করা। ট্রাম্পের কাছে তিনি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েল সফর করেছেন এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মরিয়ম রাজাভি: নির্বাসিত বিরোধী দল ‘মুজাহেদিন-ই-খালক’ (MEK)-এর নেত্রী। যদিও ইরানে তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে মার্কিন রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ তাঁকে সমর্থন করে। তাঁর সংগঠনটি একসময় বিতর্কিত থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থীরা (যেমন সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন) তাঁকে সমর্থন করেন। তিনি একটি ১০ দফার পরিকল্পনা দিয়েছেন যেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করার কথা বলা হয়েছে। তবে ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় রয়েছে।
বিপ্লবী গার্ডের কোনো ‘ডিফেক্টর’: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (IRGC) এমন কোনো জেনারেলকে খুঁজছে, যিনি বর্তমান ব্যবস্থার ওপর ক্ষুব্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে অভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড গ্রেনেল এবং মার্কো রুবিও এমন কিছু ইরানি বংশোদ্ভূত টেকনোক্র্যাট বা বিপ্লবী গার্ডের সাবেক কর্মকর্তাদের খুঁজছেন যারা দেশদ্রোহিতা করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিতে পারে। এদের মূল কাজ হবে যুদ্ধের পর প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ করা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মূল লক্ষ্য কেবল সামরিক শক্তি ধ্বংস করা নয়, বরং ইরানের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা (Regime Change)। ট্রাম্প চান এমন একজন নেতা, যিনি:
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করবেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে বৈরিতা কমিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আনবেন।
জ্বালানি তেলের বাজারে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সরকারকে মেনে নেওয়া ইরানি জনগণের জন্য কঠিন হবে।
জাতীয়তাবাদ: ইরানিরা ঐতিহাসিকভাবে বিদেশি হস্তক্ষেপ বিরোধী। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-র মদদে মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাতের ক্ষত আজও ইরানিদের মনে টাটকা।
বিপ্লবী গার্ডের বাধা: মোজতবা খামেনির পেছনে রয়েছে শক্তিশালী আইআরজিসি। তারা ট্রাম্পের পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসতে দেওয়া মানে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া বলে মনে করে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক কাউকে তেহরানের ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করে, তবে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, লিবিয়া বা ইরাকের মতো পরিস্থিতি ইরানে তৈরি হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করে দেবে।
ট্রাম্পের ‘সংক্ষিপ্ত তালিকা’ তৈরি থাকলেও তেহরানের রাজপথে সেই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। বন্দুকের নলে সরকার পরিবর্তন করা গেলেও, জনগণের মন জয় করা না গেলে ইরানের এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।