শিরোনামঃ
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩১ অপরাহ্ন

দিবস আসে দিবস যায়, নারীর ভাগ্য কি বদলায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ২৪ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ৮ই মার্চ। বিশ্বজুড়ে ঘটা করে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বেগুনি শাড়িতে রাজপথ, সেমিনার কক্ষে অধিকারের দীপ্ত ভাষণ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছার জোয়ার—সবই আছে। কিন্তু উৎসবের এই আবহের আড়ালে একটি রূঢ় প্রশ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছে: দিবস কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, নাকি সত্যিই বদলাচ্ছে নারীর ভাগ্য?

সংখ্যার হিসাবে অর্জনের খাতা

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের নারীরা অসাধ্য সাধন করেছেন। হিমালয় জয় থেকে শুরু করে ফুটবল মাঠ, কিংবা করপোরেট অফিসের শীর্ষ পদ—সবখানেই নারীর পদচারণা স্পষ্ট।

১. শিক্ষা: জেন্ডার প্যারিটি বা লিঙ্গ সমতায় বিপ্লব

বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার গত দুই দশকে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এক সময় যেখানে কন্যাশিশুদের স্কুলে পাঠানো বিলাসিতা মনে করা হতো, আজ সেখানে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

  • উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক: সরকারের উপবৃত্তি প্রকল্প এবং মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে বই বিতরণের ফলে ঝরে পড়ার হার (Dropout) নাটকীয়ভাবে কমেছে।

  • সংখ্যাগত আধিক্য: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বর্তমানে ছাত্রীদের ভর্তির হার ছাত্রদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাতেও (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে) নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

  • সামাজিক সচেতনতা: “বাল্যবিবাহ রোধ” এবং “কন্যাশিশু মানেই বোঝা নয়”—এই বার্তাটি তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবারগুলো এখন মেয়েদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করতে বেশি আগ্রহী। এটি কেবল শিক্ষার প্রসার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নারী নেতৃত্বের ভিত গড়ে দিচ্ছে।

২. অর্থনীতি: তৈরি পোশাক খাত ও আর্থিক স্বনির্ভরতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বা ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প মূলত নারীদের হাতের ছোঁয়ায় আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত।

  • বিশাল শ্রমশক্তি: দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে, যার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি শ্রমিক নারী। প্রায় ৪০ লক্ষাধিক নারী সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

  • আর্থিক ক্ষমতায়ন: গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা প্রথমবার বড় পরিসরে ঘরের বাইরে এসে মজুরিভিত্তিক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামতের গুরুত্ব বেড়েছে।

  • ক্ষুদ্রঋণ ও উদ্যোক্তা: শুধু গার্মেন্টস নয়, গ্রামাঞ্চলে হাঁস-মুরগি পালন, হস্তশিল্প এবং শহরে ই-কমার্স বা অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তার একটি বিশাল শ্রেণী তৈরি হয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন সারথি হিসেবে নারীরা এখন ফ্রিল্যান্সিং ও টেক-স্টার্টআপেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

৩. রাজনীতি: তৃণমূল থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পদচারণা

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল কোটা বা সংরক্ষিত আসনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা এখন সরাসরি ভোটে জয়ী হয়ে নেতৃত্বের প্রমাণ দিচ্ছেন।

  • তৃণমূলের ক্ষমতায়ন: ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনেও নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর ফলে স্থানীয় সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে নারীর সরাসরি তদারকি নিশ্চিত হচ্ছে।

  • জাতীয় সংসদ: বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০টি হলেও, সরাসরি নির্বাচনের (৩০০ আসন) মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে আসা নারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আমরা বেশ কয়েকজন নারী নেত্রীর বিপুল ভোটে জয়ের প্রতিফলন দেখেছি।

  • সিদ্ধান্ত গ্রহণ: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সমাজকল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে নারীরা সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে, নারীরা এখন কেবল ভোটার নন, বরং তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকা করে নিয়েছেন।

এই তিনটি খাতের অগ্রগতি একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষা দিচ্ছে সচেতনতা, অর্থনীতি দিচ্ছে স্বাধীনতা, আর রাজনীতি দিচ্ছে ক্ষমতা। এই ত্রিমুখী পরিবর্তনের ফলেই বাংলাদেশের নারীরা আজ গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।

অন্ধকারের অন্য পিঠ

এত অর্জনের ভিড়েও নারীর নিরাপত্তা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে? পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ১. ঘরে-বাইরে সহিংসতা: এখনো প্রতি বছর হাজার হাজার নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। রাস্তাঘাট বা গণপরিবহন এখনো নারীর জন্য পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে ওঠেনি। ২. মজুরি বৈষম্য: একই শ্রম দিয়েও অসংগঠিত খাতে নারী শ্রমিকের মজুরি পুরুষের তুলনায় কম। ৩. গৃহস্থালি শ্রমের অবমূল্যায়ন: ঘরের ভেতরের হাড়ভাঙা খাটুনির কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি। ‘নারী মানেই সব সইবে’—এই প্রাচীন মানসিকতা এখনো সমাজকে আঁকড়ে ধরে আছে।

দিবস যখন স্রেফ বিপণন

সমালোচকরা বলছেন, নারী দিবস এখন অনেকটা বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। শপিং মলে ছাড় কিংবা বিশেষ ‘উইমেনস ডে’ কেক কাটার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে নারীর প্রকৃত সংগ্রামকে আড়াল করছি কি না, তা ভাববার সময় এসেছে। অধিকার মানে কেবল একদিনের শুভেচ্ছা নয়; অধিকার মানে নিরাপত্তা, সমমর্যাদা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা।

দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময়

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর ভাগ্য বদলাতে হলে কেবল আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। একজন নারীকে আগে ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ঘরের কাজে পুরুষদের অংশগ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক এবারের অঙ্গীকার।

দিবস আসবে, দিবস যাবে—কিন্তু নারীর ভাগ্য তখনই বদলাবে যখন দিনশেষে একজন নারীকে তার নিরাপত্তার কথা ভেবে শঙ্কিত হতে হবে না। যখন তার মেধার মূল্যায়ন হবে লিঙ্গ দিয়ে নয়, যোগ্যতা দিয়ে। ৮ই মার্চ কেবল উদযাপনের দিন না হয়ে হোক আত্মসমালোচনার এবং নতুন করে শপথ নেওয়ার দিন।


এ জাতীয় আরো খবর...