রাজধানীর মগবাজারের ঐতিহ্যবাহী আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের আকস্মিক সরকারি সিদ্ধান্তে চরম অনিশ্চয়তা ও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়েছেন সেখানে চিকিৎসাধীন শত শত সাধারণ রোগী এবং তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে নিয়মিত কিডনি ডায়ালাইসিস নেওয়া রোগীদের পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও হাহাকার দেখা দিয়েছে। আদ্-দ্বীনের মতো সাশ্রয়ী মূল্যের হাসপাতাল ছেড়ে অন্য কোথাও তাৎক্ষণিক স্থানান্তরের জটিলতা, নতুন করে স্লট বা শয্যা না পাওয়া এবং বেসরকারি হাসপাতালের আকাশচুম্বী অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার পর গতকাল বিকেলে হাসপাতালের আশরাফ আলী ভবনের সামনে জড়ো হন ২০ থেকে ২৫ জন নিয়মিত ডায়ালাইসিস রোগী, যাদের সবারই ওই দিন ডায়ালাইসিসের পূর্বনির্ধারিত শিডিউল ছিল। কিন্তু হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়ার কারণে তারা শেষ মুহূর্তে এই জরুরি জীবনরক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হন। রাজধানী ও এর আশপাশের জেলা থেকে আসা রোগীরা ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে জানান, আদ্-দ্বীনের মতো সাশ্রয়ী মূল্যের হাসপাতাল ছেড়ে অন্য কোথাও নতুন করে ডায়ালাইসিসের শিডিউল পাওয়া যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি তা সাধারণ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে।
কিডনি বিকল হওয়া রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস কোনো সাধারণ চিকিৎসা নয়, এটি মূলত কৃত্রিম উপায়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। একজন ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) আক্রান্ত রোগীকে সাধারণত সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে হয়। প্রতিবার ডায়ালাইসিস করতে চার ঘণ্টা সময় লাগে। যদি কোনো কারণে নির্ধারিত দিনের ডায়ালাইসিস বাদ পড়ে বা কয়েক দিন দেরি হয়, তবে রোগীর শরীরে দ্রুত পানি জমতে শুরু করে, রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়, শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং একপর্যায়ে হার্ট অ্যাটাক বা ফুসফুসে পানি জমে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে হঠাৎ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই রোগীরা এখন সময়ের সাথে এক নির্মম মৃত্যুর লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।
ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হওয়ার পর রোগীরা চাইলেই অন্য যেকোনো হাসপাতালে গিয়ে সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করতে পারেন না। এর পেছনে রয়েছে আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের কিছু রূঢ় বাস্তবতা। ডায়ালাইসিসের প্রতিটি সেশনের জন্য হাসপাতালে একটি নির্দিষ্ট মেশিন এবং বেড বা শয্যা বরাদ্দ থাকতে হয়। প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেন্টারে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শিফট বা স্লট অনুযায়ী রোগীরা আগে থেকেই বুকড থাকেন। ফলে নতুন কোনো হাসপাতালে হঠাৎ করে গিয়ে ডায়ালাইসিসের সিরিয়াল বা স্লট পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে খরচের বিশাল তফাত। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ট্রাস্ট হিসেবে পরিচিত, যেখানে অত্যন্ত স্বল্প ও ভর্তুকি মূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হতো। একজন সাধারণ রোগীকে প্রতি সপ্তাহে যদি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ করে দুই বা তিনবার ডায়ালাইসিস করতে হয়, তবে মাসে শুধু ডায়ালাইসিস বাবদই খরচ হয় বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা। এর বাইরে রয়েছে ইনজেকশন, ওষুধ এবং নিয়মিত রক্তের পরীক্ষার খরচ। অন্যান্য কর্পোরেট বা বড় বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের খরচ আদ্-দ্বীনের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ। হঠাৎ করে এই বাড়তি খরচের বোঝা বহন করার মতো কোনো আর্থিক প্রস্তুতি এই মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোর থাকে না। ফলে সেবা বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো তাদের চিকিৎসার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়া।
মগবাজারের এই হাসপাতালের ওপর শুধু ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, বরং এর চারপাশের এবং ঢাকার বাইরের বহু দূর-দূরান্তের রোগী নির্ভরশীল ছিলেন। অনেক কিডনি রোগী এই হাসপাতালের সুবিধাজনক দূরত্বের কথা চিন্তা করে এর কাছাকাছি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন, যেন সপ্তাহে তিন দিন সহজে এসে ডায়ালাইসিস করে চলে যেতে পারেন। ডায়ালাইসিস করে ওঠার পর একজন রোগীর শরীরের রক্তচাপ মারাত্মকভাবে ওঠানামা করে। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরায় এবং অনেকে অচেতন হয়ে পড়েন। এই শারীরিক মরণযন্ত্রণার পর রোগীকে দ্রুত বিশ্রামে নিতে হয়।
এখন আদ্-দ্বীন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মগবাজারের একজন রোগীকে যদি ডায়ালাইসিসের জন্য সাভার, উত্তরা বা ঢাকার অপর প্রান্তে যেতে হয়, তবে তা তাদের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। ঢাকার তীব্র যানজটের মধ্য দিয়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা জার্নি করে দূরবর্তী কোনো হাসপাতালে যাওয়া এবং ডায়ালাইসিস শেষে অত্যন্ত দুর্বল শরীরে আবার জ্যাম ঠেলে ফিরে আসা একজন মুমূর্ষু রোগীর পক্ষে অসম্ভব। দূরত্বের এই ধকল এবং যাতায়াত খরচের বাড়তি চাপ অনেক রোগীকে ডায়ালাইসিস নেওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য করবে, যা তাদের সরাসরি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এই বিপর্যয় দেশের স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় ক্ষতকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে, আর তা হলো সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে ডায়ালাইসিস সেন্টারের তীব্র অভাব। দেশে বর্তমানে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটির ওপরে, যার মধ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের কিডনি পুরোপুরি বিকল হচ্ছে। সেই তুলনায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ডায়ালাইসিস সেন্টারের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নামমাত্র মূল্যে যে ডায়ালাইসিস দেওয়া হয়, সেখানে একটি স্লট পাওয়ার জন্য রোগীকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরজুড়েও অপেক্ষায় থাকতে হয়।
এই চরম সংকটের বাজারে আদ্-দ্বীনের মতো একটি বড় এবং সচল ডায়ালাইসিস সেন্টার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে দেশের সীমিত ডায়ালাইসিস ব্যবস্থার ওপর আরও বড় ধস নামা। আদ্-দ্বীনের কয়েক শ নিয়মিত রোগী যখন একযোগে অন্য হাসপাতালগুলোতে সিরিয়ালের জন্য ভিড় করবেন, তখন অন্যান্য হাসপাতালের বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। ফলে তৈরি হবে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হবেন অসহায় সাধারণ রোগীরা। আমাদের দেশে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে উন্নত ডায়ালাইসিস সেন্টার না থাকায় এমনিতেই রোগীদের ঢাকায় আসতে হয়, তার ওপর ঢাকার ভেতরের এমন সচল কেন্দ্র বন্ধ হওয়া গ্রামীণ ও প্রান্তিক রোগীদের আরও বেশি বিপদে ফেলবে।
ডায়ালাইসিস রোগীদের পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য জরুরি বিভাগের রোগীরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ আসার পরও এনআইসিইউতে ৫০ জন, আইসিইউতে ১৩ জন এবং সিসিইউতে ৬ জনসহ মোট ২৪৩ জন গুরুতর রোগী ভর্তি রয়েছেন। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক অসহায় পিতা-মাতা জানিয়েছেন, তাদের সদ্যজাত সন্তানদের অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক যে এই মুহূর্তে তাদের অন্য কোথাও স্থানান্তর করা অসম্ভব। অনেক বড় বড় হাসপাতালে যোগাযোগ করেও আইসিইউ বা এনআইসিইউ বেড খালি পাওয়া যাচ্ছে না, আর যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানকার দৈনিক খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য এসব নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নেই। ফেনী থেকে আসা হায়দার আলী জানান, তাঁর ৪০ দিন বয়সী ছেলের দুটি অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং সে এখনো গুরুতর অসুস্থ। এমন অবস্থায় রোগীকে নিয়ে কোথায় যাবেন, তা নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ দিশেহারা।
হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়েছে, যেখানে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে রোগীদের মানবিক দিক বিবেচনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রয়োজনে এই সময়সীমা সামান্য বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। একই সাথে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই আদেশের বিরুদ্ধে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করার আইনি সুযোগ পাবে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সরকারের কাছে আপিল জমা দেবেন। তবে চূড়ান্ত কোনো আইনি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত, জনস্বার্থ এবং চিকিৎসাধীন ২৪৩ জন রোগীর জীবনের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে বিশেষ করে ডায়ালাইসিস সেবা ও জরুরি আইসিইউ কার্যক্রম সাম্যয়িকভাবে চালু রাখার জন্য তারা সরকারের প্রতি জোর আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের এই কঠোর ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একটি মর্মান্তিক ঘটনা। গত ২৭ মে ভোরে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে মাত্র ১ থেকে ৩ দিন বয়সীoffset ছয়টি নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যু হয়। এক রাতে এতগুলো শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে হাসপাতালটির সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির বিষয়ে তদন্ত শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই তদন্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই অবশেষে বৃহস্পতিবার হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করার চূড়ান্ত ঘোষণা দেয় সরকার। তবে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে চিকিৎসাধীন শত শত নিরপরাধ রোগীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা কতটুকু যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
তথ্য: দৈনিক বণিক বার্তা