উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সবুজ গালিচায় সদ্যই পর্দা উঠেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। ফুটবল বিশ্ব যখন নতুন এই বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে চরম উন্মাদনায় মেতেছে, ঠিক তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে এক বিদায়ের করুণ সুর। এবারের আসরটি কেবলই ট্রফি জয়ের লড়াই নয়; এটি আসলে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সোনালী, সবচেয়ে প্রভাবশালী একটি প্রজন্মের ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ বিদায়বেলা। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র এবং লুকা মদ্রিচের মতো মহাতারকাদের আর কখনোই, কোনোদিন একসঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে না। জীবনের শেষ গোধূলিতে দাঁড়িয়ে এই বরপুত্ররা এবার মাঠে নামছেন তাদের আজীবনের লালিত স্বপ্নকে শেষবারের মতো স্পর্শ করতে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে লিওনেল মেসি ইতিমধ্যেই ফুটবলীয় অমরত্ব পেয়ে গেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৬টি ম্যাচ খেলার অলৌকিক রেকর্ডটি এখনই তাঁর পকেটে। ঝুলিতে আছে ১৩টি গোল আর ৮টি অ্যাসিস্ট। তবে এবারের আসরে ৩৯ ছুঁইছুঁই এলএম-টেনের সামনে সুযোগ রয়েছে মিরোস্লাভ ক্লোজের ১৬ গোলের সর্বকালীন রেকর্ডটি ভেঙে নিজের করে নেওয়ার। আগামী ২৪শে জুন বিশ্বকাপ চলাকালীনই ৩৯ বছরে পা দেবেন এই জাদুকর। ২০৩০ বিশ্বকাপে বয়স ৪২ হয়ে যাবে বলে এটিই যে তাঁর শেষ আসর, তা বলাই বাহুল্য। গ্রুপ ‘জে’-তে অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া আর জর্ডানের মুখোমুখি হওয়া বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবারও হট ফেভারিট। তারুণ্যের গতি আর মেসির অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে আলবিসেলেস্তেরা কি পারবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয় করতে?
মুদ্রার ওপিঠে আছেন ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলমেশিন এবং চিরন্তন যোদ্ধা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সে এসে সিআর-সেভেন খেলতে যাচ্ছেন তাঁর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, যা ফুটবল ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও অনন্য নজির। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১৪৩ গোল নিয়ে চূড়ায় থাকা রোনালদো আর মাত্র ৭টি গোল করতে পারলে দুনিয়ার প্রথম ফুটবলার হিসেবে ১৫০ আন্তর্জাতিক গোলের অবাস্তব এক মাইলফলক স্পর্শ করবেন। পর্তুগাল যদি এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তবে রোনালদো হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার। তবে এতসব কীর্তির মাঝেও একটি পরিসংখ্যান তাঁর বুকে কাঁটার মতো বিঁধে আছে—বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এখনো কোনো গোল নেই রোনালদোর! ক্যারিয়ারের এই শেষ সুযোগে কি সেই অপূর্ণতা ঘোচাতে পারবেন এই মহাতারকা?
এরপরই আসে সাম্বার দেশের সেই জাদুকর নেইমার জুনিয়রের কথা। ২০২৩ সালের অক্টোবরের সেই ভয়াবহ এসিএল (ACL) ইনজুরি নেইমারের ক্যারিয়ার থেকে কেড়ে নিয়েছিল মূল্যবান প্রায় দুটি বছর। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন বিশ্বকাপের স্কোয়াড সাজাচ্ছিলেন, তখন নেইমারকে স্কোয়াডে রাখা নিয়ে অনেক সংশয় তৈরি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, সেলেসাওদের জার্সিতে নেইমারের বিশ্বকাপের দরজা বুঝি চিরতরেই বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে, ইনজুরি কাটিয়ে শেষ মুহূর্তে ২৬ জনের চূড়ান্ত দলে ডাক পেয়েছেন এই পোস্টার বয়। নেইমার নিজেই এর আগে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। ২০০২ সালের পর দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে ব্রাজিল বিশ্বজয়ের স্বাদ পায়নি। নেইমারের কাঁধে তাই শুধু নিজের স্বপ্ন নয়, কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ানের দুই দশকের দীর্ঘশ্বাস আর প্রত্যাশার এক বিশাল পর্বত।
গল্পটা শুধু এই তিন প্রধান নায়কেরই নয়। ৪০ বছর বয়সী ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড জাদুকর লুকা মদ্রিচ, যিনি ২০১৮ সালে রূপকথার মতো দলকে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন, এটি তাঁরও পঞ্চম ও শেষ বিশ্বকাপ। জার্মানির গোলপোস্টের নিচে যুগের পর যুগ প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো ৪০ বছর বয়সী ম্যানুয়েল নয়ারও খেলছেন শেষবারের মতো। আর এশিয়ার ফুটবলের গৌরব, দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিয়ং মিন নিজের দেশের হয়ে রেকর্ড ১৩৯টি ম্যাচ খেলার পর দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চে।
সব আবেগ একপাশে সরিয়ে যদি বুকমেকার এবং প্রেডিকশন মার্কেটের দিকে চোখ ফেরানো যায়, তবে এবারের আসরে ট্রফি জয়ের দৌড়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে স্পেন ও ফ্রান্স। স্পেনের সম্ভাবনা যেখানে প্লাস ৪৭০, সেখানে ফ্রান্স প্লাস ৪৮০ অনুপাতে প্রায় ১৬ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ঘুরছে। এর ঠিক পরেই রয়েছে ব্রাজিল (প্লাস ৮৫০) এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা (প্লাস ৯০০ বা ১০০০)। আর্জেন্টিনা যদি এবার শিরোপা ধরে রাখতে পারে, তবে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর তারা হবে ইতিহাসের প্রথম দল, যারা পরপর দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে। বাকি সম্ভাবনাগুলো ভাগ হয়ে আছে ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলগুলোর মধ্যে।
পেলের যুগ শেষ হয়েছে, ম্যারাডোনাও একসময় বিদায় নিয়েছেন—কারণ প্রকৃতির নিয়মেই সব সুন্দর যুগের অবসান ঘটে। এবার আমাদের চোখের সামনে শেষ হতে চলেছে মেসি, রোনালদো, নেইমারদের সেই চিরচেনা সোনালী অধ্যায়। তবে বুট জোড়া তুলে রাখার আগে এই ফুটবল বিধাতারা লিখে যেতে চান তাঁদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম চিত্রনাট্য। একটি শেষ ট্রফি, একটি শেষ বিজয়ীর হাসি আর চিরস্মরণীয় এক বিদায়ের মঞ্চ তৈরিতে বুঁদ হয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস ২৪