শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:১১ অপরাহ্ন

টফি ও বায়োস্কোপের বিশ্বকাপ সম্প্রচার বিভ্রাট: প্রতারণার অভিযোগে ক্ষুব্ধ লাখো দর্শক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

বাঙালি আর ফুটবল—এই দুইয়ের আবেগ যেন একই সুতোয় গাঁথা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশজুড়ে যখন চরম উন্মাদনা, ঠিক তখনই ফুটবলপ্রেমীদের সেই আবেগকে পুঁজি করে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলার অভিযোগ উঠেছে দেশের শীর্ষ দুটি ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম—‘টফি’ এবং ‘বায়োস্কোপ’-এর বিরুদ্ধে। খেলা দেখার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন বা ডিজিটাল পাস কিনেও লাখ লাখ ব্যবহারকারী খেলা দেখতে পারেননি। ম্যাচ শুরু হতেই স্ক্রিন ফ্রিজ হয়ে যাওয়া বা ‘সার্ভার এরর’ ভেসে ওঠার মতো ঘটনার পর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা এখন একযোগে দাবি তুলেছেন—”পরিষেবা নেই, তো টাকা কেন? আমাদের রিফান্ড চাই।”

প্রস্তুতি ছাড়া পকেট কাটার মহোৎসব?

গ্রাহকদের প্রধান এবং সবচেয়ে যৌক্তিক অভিযোগটি হলো—পর্যাপ্ত কারিগরি প্রস্তুতি না নিয়ে কেবল সাবস্ক্রিপশন বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পকেটে তোলার লোভ। বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো মেগা ইভেন্টে যখন হাই ভোল্টেজ ম্যাচ চলে, তখন একযোগে কোটি মানুষের স্ক্রিনে চোখ রাখা খুব স্বাভাবিক বিষয়। যেকোনো আইটি প্রফেশনাল এই কনকারেন্ট ইউজার (একই সময়ে লাইভ হিট) বা ট্রাফিকের সাধারণ হিসাবটা বোঝেন।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাংলালিংকের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘টফি’ এবং গ্রামীণফোনের ‘বায়োস্কোপ’ এই মেগা ইভেন্টের হাইপ বা উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে ধুমধাম সাবস্ক্রিপশন বিক্রি করলেও, সেই বিপুল ট্রাফিক সামলানোর মতো কোনো সার্ভার ব্যাকআপ, ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করেনি। সহজ কথায়, ১০ জন বসার ঘরে তারা জোর করে এক হাজার জনকে ঢোকাতে চেয়েছে। ফলে ম্যাচ শুরু হতেই পুরো সিস্টেম তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সার্ভার রিডন্ডেন্সি এবং লোড ব্যালেন্সিং করার সক্ষমতা যদি না-ই থাকে, তবে কিসের ভিত্তিতে তারা টাকা নিয়ে ডিজিটাল পাস বিক্রি করল? এটি কি এক ধরনের সুপরিকল্পিত ডিজিটাল প্রতারণা নয়?

দায় এড়াতে বিটিভির ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা

নিজেদের এই বিশাল কারিগরি ব্যর্থতা ঢাকার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলো পরবর্তীতে যে অজুহাত দিয়েছে, তা গ্রাহকদের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো লেগেছে। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, অ্যাপ ক্র্যাশ করার পর হেল্পলাইন বা বিভিন্ন মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কিংবা ডাউনলিংক ফিডের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে। দাবি করা হয়েছিল—কন্ট্রোল রুম থেকে সিগন্যাল বিভ্রাট ছিল।

তবে সচেতন ব্যবহারকারীরা এই যুক্তি এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কারণ, একই সময়ে যখন বিটিভির টেরেসট্রিয়াল বা সাধারণ কেবল (ডিশ) লাইনে খেলা একদম পরিষ্কার ও ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছিল, তখন এই অ্যাপগুলোতে কেন ব্ল্যাকআউট বা অন্তহীন বাফারিংয়ের চাকা ঘুরবে? ফিডে বা সিগন্যালে সমস্যা থাকলে তো টিভিতেও সমস্যা হতো। বিটিভিও এই দায় নিতে নারাজ। কারণ বিটিভির কাজ ছিল সবাইকে সমান ও পরিষ্কার ‘ক্লিন ফিড’ দেওয়া। তারা টফি, বায়োস্কোপ, টি স্পোর্টস, সময় টিভিসহ সব পক্ষকেই সঠিক ফিড সরবরাহ করেছে। বাকিরা যেখানে ঠিকঠাক সম্প্রচার করতে পেরেছে, সেখানে শুধু টফি আর বায়োস্কোপের ব্যর্থতা প্রমাণ করে—বিটিভির ওপর দোষ চাপানোটা ছিল স্রেফ নিজেদের অযোগ্যতা এবং দুর্বল ব্যান্ডউইথ ম্যানেজমেন্ট ঢাকার এক সস্তা চাপাবাজি।

টাকা গেল, নষ্ট হলো ফুটবলপ্রেমীদের আবেগও

বাংলাদেশে রাত জেগে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে বড় স্ক্রিনে বা স্মার্ট ডিভাইসে খেলা দেখার একটি আলাদা সামাজিক সংস্কৃতি রয়েছে। অনেকেই কেবল টিভি বাদ দিয়ে ল্যাপটপ, মোবাইল বা স্মার্ট টিভিতে এইচডি (HD) কোয়ালিটিতে খেলা উপভোগ করার জন্য কষ্টের অর্জিত টাকা দিয়ে এই ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রিমিয়াম প্যাক কিনেছিলেন।

এখানে ব্যবহারকারীদের শুধু আর্থিক ক্ষতি হয়নি, নষ্ট হয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের আবেগ ও উত্তেজনা। একটি হাই ভোল্টেজ ম্যাচের লাইভ দেখার উত্তেজনা কি পরের দিন সকালে হাইলাইটস দেখে মেটানো সম্ভব? কখনোই না। গ্রাহকদের স্পষ্ট কথা—তারা কেউ এখানে ‘ফ্রি’ বা বিনামূল্যে খেলা দেখতে আসেননি। নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়ার অধিকার তাদের ছিল। এই চরম মানসিক হয়রানির ক্ষতিপূরণ কে দেবে? সে কারণেই অনেকে এখন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে (DNCRP) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মার্কেটিংয়ে কোটি টাকা, প্রযুক্তিতে কার্পণ্য

বিশ্বজুড়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কোটি কোটি মানুষের লাইভ স্ট্রিমিং অনায়াসে সামলাচ্ছে। নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন প্রাইমের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের কথা বাদ দিলেও, পাশের দেশ ভারতেই আইপিএল বা বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে কোটি কোটি দর্শককে একসাথে লাইভ খেলা দেখায় জিও সিনেমা, হটস্টার বা সনি লিভ। তাদের সার্ভার তো এভাবে ক্র্যাশ করে না। কারণ তারা কন্টেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (CDN) উন্নত করতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে।

অথচ আমাদের দেশের শীর্ষ কর্পোরেট ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো মার্কেটিং ও বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি টাকা ওড়ালেও, আসল জায়গা অর্থাৎ কারিগরি অবকাঠামো ও সার্ভার সক্ষমতা বাড়াতে চরম কার্পণ্য করে। বায়োস্কোপের মূল মালিক গ্রামীণফোন যেখানে বছরের প্রথম তিন মাসেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে, সেখানে তাদের ওটিটি অ্যাপের এই ল্যাজেগোবরে পারফরম্যান্স অত্যন্ত লজ্জাজনক।

ডিজিটাল বাংলাদেশে টাকা নিয়ে সেবা না দেওয়ার এই সংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া যায় না। ট্রফি এবং বায়োস্কোপ যদি সত্যিই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতারণা না করে থাকে, তবে ব্র্যান্ড ভ্যালু ধূলিসাৎ হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে তাদের উচিত অবিলম্বে প্রতিটি ভুক্তভোগী গ্রাহকের টাকা রিফান্ড বা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা। একই সাথে, ভবিষ্যতে এমন মেগা ইভেন্ট লাইভ করার আগে নিজেদের টেকনিক্যাল সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...