শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন

পদ্মা ব্যারাজ সত্ত্বেও গঙ্গা চুক্তি নবায়নে জটিলতার আশঙ্কা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। তিন দশক মেয়াদি এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির নবায়ন নিয়ে যখন দুই দেশের নীতিপ্রস্তুতি ও আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ঢাকার একনেক সভায় অনুমোদন পেয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প। এই বড় অবকাঠামোটি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব বা নতুন জটিলতা তৈরি করবে কিনা, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, কূটনৈতিক ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কারিগরি নকশার কারণে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ফলে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে নতুন কোনো সংকট তৈরি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

সীমান্ত থেকে দূরত্ব ও পানিপ্রবাহের বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের অবস্থান বেশ ভেতরে বা দূরে হওয়ায় এটি আন্তঃসীমান্ত স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে না। গত ৩০ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি কোনো মৌলিক আপত্তি ছাড়াই বাস্তবায়িত হয়ে আসছে এবং দুই দেশই এটি নবায়নের ব্যাপারে ইতিবাচক। ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, ব্যারাজের কারণে পানিপ্রবাহে কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা তা হাইড্রোলজিক্যাল তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তবে যেহেতু এই ব্যারাজের অবস্থান বাংলাদেশের বেশ ভেতরে, তাই ভারতের দিকে পানিপ্রবাহে এর কোনো প্রভাব ফেলার কথা নয় এবং এটি নিয়ে কোনো ভুল ন্যারেটিভ বা অপপ্রচার তৈরি হওয়া উচিত নয়।

উজানের বন্যা রোধে সতর্ক কারিগরি নকশা

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের মনে একটি প্রচ্ছন্ন শঙ্কা থাকতে পারে যে, ব্যারাজটি উঁচু করা হলে শুষ্ক বা বর্ষা মৌসুমে উজানে (ভারতের অংশে) কৃত্রিম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবের (ডিপিপি) সাথে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই শঙ্কা দূর করতে ব্যারাজের নকশা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করা হয়েছে। ব্যারাজটির উচ্চতা সাড়ে ১২ মিটার পিডব্লিউডি (PWD) নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই সীমান্ত পেরিয়ে উজানে বন্যা সৃষ্টি করবে না। বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত এই নকশায় প্রতিবেশী দেশের সুরক্ষার সব ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি না হয়।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও কৃষিতে দৃশ্যমান বিপ্লব

গত ১৩ মে সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এই মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ করা এবং গড়াই-মধুমতী, ইছামতী-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া ও বড়াল নদী সিস্টেমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা।

এই ব্যারাজটি নির্মিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর আবাদি জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। এর ফলে দেশে বার্ষিক ধান উৎপাদন ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রকল্পটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে। অর্থনৈতিকভাবে এই প্রকল্প থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা প্রত্যক্ষ রিটার্ন আসবে এবং নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

নীতিনির্ধারকদের আশাবাদ ও চুক্তি নবায়নের অগ্রগতি

গঙ্গা চুক্তি এবং ব্যারাজ নির্মাণ—দুটি বিষয়ই মূলত ষাটের দশক থেকে এ অঞ্চলে আলোচনায় ছিল। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) ফারাক্কা পয়েন্টে নদীর পানিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের সুনির্দিষ্ট অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা গত তিন দশক ধরে সফলভাবে চলছে।

বর্তমান সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী অ্যানি চুক্তি নবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কারিগরি টিমগুলো ইতিমধ্যে ভারতের ফারাক্কা এলাকায় গিয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পন্ন করেছে। দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে শীঘ্রই এই চুক্তিটি ইতিবাচকভাবে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পদ্মা ব্যারাজ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি সীমান্ত থেকে অনেক দূরে আমাদের অভ্যন্তরীণ ও নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এই প্রকল্প নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি বা আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়নি, ফলে গঙ্গা চুক্তি যথাসময়েই নবায়িত হবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...