সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন

উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ: মাঠের আড়ালে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ফুটবল বিশ্বকাপ’ এখন মাঠের লড়াইয়ে জমজমাট। তবে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টটি কেবলই ১৬টি শহর আর সবুজ মাঠের ফুটবলীয় উন্মাদনায় সীমাবদ্ধ নেই। মহাদেশীয় পরিসরের এই বিশাল ক্রীড়াযজ্ঞটি উত্তর আমেরিকার তিন প্রতিবেশীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনকে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং বিশ্বনেতাদের হাসিমুখের সেলফি একটি সফল আয়োজনের বার্তা দিলেও, পর্দার আড়ালে থাকা বাণিজ্য যুদ্ধ, অভিবাসন সংকট এবং কূটনৈতিক দূরত্বের তীব্রতা কোনোভাবেই ঢাকা দেওয়া যাচ্ছে না।

ট্রাম্পের আধিপত্যবাদ ও প্রতিবেশীদের ক্ষোভ

এবারের যৌথ আসরের সমীকরণটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের কঠোর নীতির কারণে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে এ অঞ্চলের একক ‘প্রধান শক্তি’ হিসেবে জাহির করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এই উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান স্বাগতিক অপর দুই দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর রাজনৈতিক মহলে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া একতরফা শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর মতো বিতর্কিত মন্তব্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় অতীতে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন পানীয় বর্জন এবং সে দেশে কানাডিয়ানদের ভ্রমণ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল, যা এখনো দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের মনে এক ধরনের তিক্ততা জিইয়ে রেখেছে।

বাণিজ্য কূটনীতি ও মেক্সিকোকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা

তিন প্রতিবেশীর এই জটলা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একক আগ্রাসনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কানাডা ও মেক্সিকোর নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ঝড় থেকে নিজেদের বাঁচাতে কানাডা একপ্রকার মেক্সিকোকে ‘বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছিল’। কানাডা ও মার্কিন প্রশাসনের একাংশের অভিযোগ ছিল, মেক্সিকো মূলত উত্তর আমেরিকার বাজারে চীনা বিনিয়োগের একটি “পেছনের দরজা” বা ট্রানজিট হিসেবে কাজ করছে। এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে এখন একদিকে যেমন মেক্সিকোর সাথে ক্ষুণ্ন হওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমাতে বাধ্য হয়ে নিজেদের বাণিজ্য বহুমুখীকরণের কঠিন পথ বেছে নিতে হচ্ছে।

ইমিগ্রেশন জটিলতা ও কঠোর নিরাপত্তা বলয়

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশের যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটি একটি নজিরবিহীন লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ম্যাচ দেখার জন্য লাখ লাখ ফুটবল সমর্থক যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত কঠোর ও জটিল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (ইমিগ্রেশন) পর্যটকদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের কারণে ওয়াশিংটন তাদের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ জোরদার করেছে। ফলস্বরূপ, যেকোনো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বা সাধারণ লজিস্টিক জটিলতাও যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যৌথভাবে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন মানেই যে দেশগুলোর মধ্যে মধুর সম্পর্ক তৈরি হবে—এমন ভাবার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। যেমনটি ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ আসরেও এক ধরনের ‘অম্ল-মধুর’ এবং অমীমাংসিত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন দেখা গিয়েছিল।

মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ সংকট আড়ালের চেষ্টা

বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এই মুহূর্তে বেশ নাজুক, যা তারা এই বৈশ্বিক উৎসবের আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে। দেশটির প্রধান বিমানবন্দরগুলোর অব্যবস্থাপনা, যানজটপূর্ণ গণপরিবহন এবং ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের তাড়াহুড়ো করে করা সংস্কার কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। এর ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে মাদক কার্টেল বা অপরাধী চক্রের সহিংসতা এবং দেশটির প্রধান শিক্ষক ইউনিয়নের জাতীয় পর্যায়ের ধর্মঘট। আন্দোলনকারীদের “সমাধান না হলে, খেলা শুরু হবে না” স্লোগানটি বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ করার হুমকি দিচ্ছে। যদিও মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবম এই টুর্নামেন্টকে তাদের বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ‘ক্ষমতাবান জাতি’ হিসেবে তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন, তবে মেক্সিকান ক্রীড়া সাংবাদিকদের মতে, দেশের ভেতরের এই ক্ষতগুলো ফুটবলপ্রেমীদের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করাটা হবে এক ধরনের আত্মঘাতী ভুল।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরীক্ষা

এই বিশ্বকাপটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন তিন দেশই ঐতিহাসিক উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) পর্যালোচনার একটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৪ সাল থেকে চলে আসা এই অর্থনৈতিক জোটের ভবিষ্যৎ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে মেক্সিকো ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এককভাবে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক আলোচনা শুরু করে দিয়েছে, যা কানাডা এখনো করতে পারেনি। অন্যদিকে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষার প্রশ্নে কানাডা ও মেক্সিকো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী মেরুতে অবস্থান করছে।

খেলাধুলা সবসময়ই অপ্রত্যাশিত, আর ফুটবল কূটনীতির এই মহাদেশীয় পরীক্ষাটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে তা বলা কঠিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বভাবসুলভভাবেই প্রচারের আলো নিজের দিকে টেনে নিতে ব্যাকুল, যা হয়তো বাকি দুই প্রতিবেশীর মাঝে নতুন করে ইর্ষা বা ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। তবে টুর্নামেন্টের সাফল্যের সাথে যেহেতু তিন দেশেরই অর্থনৈতিক ও ভাবমূর্তির স্বার্থ জড়িত, তাই নেতারা হয়তো এমন কোনো বড় কূটনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন যা এই বৈশ্বিক উৎসবকে কলঙ্কিত করতে পারে। মাঠের ফুটবল শেষ পর্যন্ত একটি সমতায় শেষ হলেও, উত্তর আমেরিকার এই ত্রিপক্ষীয় ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের অবসান যে এত দ্রুত হচ্ছে না—তা এই বিশ্বকাপেরই প্রতিটি পরতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

তথ্য: বিবিসি বাংলা


এ জাতীয় আরো খবর...