ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের প্রায় পুরো উপরিভাগ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর আজ বুধবার (১১ মার্চ) তেহরানে এক শোকাবহ ও নজিরবিহীন জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অব্যাহত হামলার হুমকি উপেক্ষা করেই দেশটির লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন তাঁদের নিহত নেতাদের শেষ বিদায় জানাতে।
আজকের এই যৌথ জানাজাটি ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিহতদের তালিকায় নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ) এবং বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি)-এর প্রধানসহ শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নীতিনির্ধারক রয়েছেন। জানাজায় উপস্থিত মরদেহের মধ্যে ছিলেন:
আব্দুর রহিম মুসাভি: সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ প্রধান।
মোহাম্মদ পাকপুর: আইআরজিসি (বিপ্লবী গার্ডস) প্রধান।
আজিজ নাসিরজাদে: প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
আলী শামখানি: প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব।
মোহাম্মদ শিরাজি: সর্বোচ্চ নেতার সামরিক দপ্তরের প্রধান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোহাম্মদ শিরাজির মৃত্যু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি সর্বোচ্চ নেতা ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘বায়েত-ই রেহবারি’ (নেতার কার্যালয়) লক্ষ্য করে চালানো শক্তিশালী কোনো ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ হামলায় এই শীর্ষ নেতারা একসঙ্গে নিহত হয়েছেন।
তেহরানের এনকেলাব (বিপ্লব) চত্বর থেকে ‘মেরাজ-ই শোহাদা’ (শহীদ মাজার) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মানুষের সমাগম। উপস্থিত জনতার হাতে ছিল সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বর্তমান নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ছবি। কান্নার রোলে ভারী হয়ে ওঠে তেহরানের আকাশ।
ইরানি শাসকগোষ্ঠী এই সংঘাতকে ‘রমজান ইম্পোজড ওয়ার’ বা রমজানে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করছে। ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ধর্মীয় আবেগের মাধ্যমে শোকাতুর জনগণকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে বর্তমান প্রশাসন।
আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের ল এনফোর্সমেন্ট কমান্ডের (ফারাজা) গোয়েন্দা প্রধান গোলামরেজা রেজাইয়ান তেহরানে ইসরায়েলের প্রাথমিক বিমান হামলার সময় নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও ডজনখানেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম নিহতের তালিকায় রয়েছে, যাদের পদমর্যাদা নিরাপত্তার স্বার্থে এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
শীর্ষ নেতৃত্বের এই শূন্যতা ইরানকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে সামরিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার ঝুঁকি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে ইরানের ইতিহাসে এটি অন্যতম কঠিন সময়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই কমান্ডারদের মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।