ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল খরচের বোঝা চাপিয়ে দিতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘জিরো কার্বন অ্যানালাইটিকস’ (জেডসিএ)-এর এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক আশঙ্কাজনক তথ্য। সংস্থাটির মতে, চলমান সংকটের কারণে চলতি বছর বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যেতে পারে। এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১.১ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অত্যাধিক নির্ভরতাই বাংলাদেশকে এই সংকটের মুখে ফেলেছে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে তেলের বাজার চড়তে থাকায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আমদানি সক্ষমতা ৫.৭ মাস থেকে কমে ৪.৯ মাসে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
জ্বালানির এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের শিল্প উৎপাদনেও। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরামকো থেকে আসা এক লাখ টন তেলের চালান বিলম্বিত হয়েছে। অন্যদিকে, কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ৭৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে চারটি সার কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে জেনারেটর চালানোর মতো পর্যাপ্ত ডিজেলও অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অনেক শিল্প উদ্যোক্তা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জীবাশ্ম জ্বালানির এই চরম সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতি অনেকটা থমকে আছে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বছরে ৭৬০ মেগাওয়াট সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে তার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস ও বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত নজর না দিলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প ও অর্থনীতির এই নেতিবাচক ধারা থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে।