দেশের জ্বালানি খাতে চলমান অস্থিরতা, মজুতদারি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার সুযোগ নিয়ে সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় এবার কঠোর ও যুগান্তকারী আইনি ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। পেট্রোল পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড় এবং তেল নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি পুরোপুরি বন্ধ করতে দেশের সব ধরনের যানবাহনের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’ বা জ্বালানি কার্ড চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এই কার্ড ছাড়া ভবিষ্যতে আর পাম্প থেকে তেল কেনা যাবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ এবং অসাধু চক্রের কারসাজি
বাংলাদেশ মূলত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে একটি আমদানিনির্ভর দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই বৈশ্বিক অস্থিরতার সুযোগটিই নিচ্ছে দেশের ভেতরের একটি অসাধু চক্র। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকটের যে আশঙ্কা রয়েছে, সেটিকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিক অবৈধভাবে তেল মজুত করে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে, যার ফলে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করছেন।
সরবরাহ স্বাভাবিক, সংকট শুধুই কৃত্রিম
বাজারে তেলের এই হাহাকার ও মজুতদারির বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি আশ্বস্ত করে জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দেশে যে পরিমাণ তেলের সরবরাহ ছিল, বর্তমানেও ঠিক একই পরিমাণ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
তাহলে পাম্পগুলোতে কেন তেল পাওয়া যাচ্ছে না? এর জবাবে মন্ত্রী বলেন, মূলত হঠাৎ করে বাজারে তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মজুতদারদের অবৈধ কারসাজি এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনার কারণেই পাম্পগুলো থেকে দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি এই কৃত্রিম সংকটের পেছনে অসাধু মজুতদারদের ভূমিকাকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন।
কী এই ‘ফুয়েল কার্ড’ এবং কীভাবে কাজ করবে?
তেলের এই অপচয়, অবৈধ মজুত এবং কালোবাজারি ঠেকাতে সরকার ‘ফুয়েল কার্ড’ ব্যবস্থাকে একটি চূড়ান্ত ও কার্যকর ডিজিটাল সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে। ফুয়েল কার্ড হলো মূলত একটি বিশেষায়িত স্মার্ট পেমেন্ট কার্ড, যা শুধু পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানি কেনার জন্যই ব্যবহার করা যাবে। এটি দেখতে সাধারণ ব্যাংক ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মতো হলেও এর কার্যকারিতা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই কার্ডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো রেশনিং বা ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার অধীনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও ট্রাকের মতো প্রতিটি যানের ধরন অনুযায়ী জ্বালানি নেওয়ার একটি নির্দিষ্ট দৈনিক বা মাসিক সীমা (কোটা) নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। নির্ধারিত সীমার বাইরে কেউ চাইলেও অতিরিক্ত তেল কিনতে পারবেন না। প্রতিটি ফুয়েল কার্ডে একটি সুরক্ষিত ‘কিউআর কোড’ (QR Code) যুক্ত থাকবে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে থাকা স্মার্ট স্ক্যানারের মাধ্যমে ওই কোড স্ক্যান করে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে হবে। এর ফলে কোন গাড়ি কবে, কোথা থেকে, কী পরিমাণ তেল নিচ্ছে—তার পুরো ডিজিটাল রেকর্ড সরকারের কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত থাকবে।
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও কালোবাজারি রোধে নতুন দিগন্ত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাতে যে সিস্টেম লস, চুরি ও কালোবাজারির অভিযোগ রয়েছে, ফুয়েল কার্ড চালু হলে তা অনেকাংশেই কমে আসবে। এ ধরনের একটি সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হলে জ্বালানি খাতে অভাবনীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। কেউ চাইলেই আর ড্রাম ভরে তেল কিনে অবৈধভাবে মজুত করতে পারবে না, ফলে তেলের অপচয় যেমন কমবে, তেমনি প্রকৃত গ্রাহকরা ন্যায্যমূল্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল পাবেন।