মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে হাম—বাড়ছে নিউমোনিয়া ও এনসেফালাইটিসের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩২ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

বর্তমানে দেশে শিশুদের মধ্যে হামের (Measles) সংক্রমণ এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে এখন জ্বর, তীব্র কাশি আর শরীরজুড়ে লালচে র‍্যাশ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হাম কেবল সাধারণ কোনো জ্বর বা চর্মরোগ নয়; সঠিক সময়ে সচেতন না হলে এটি নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিসের মতো ভয়াবহ জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনে হামের ভয়াবহতা ও প্রতিরোধের উপায়গুলো তুলে ধরা হলো।


১. সংক্রমণের তীব্রতা: বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর সংক্রমণের ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, একজন আক্রান্ত শিশু গড়ে ১৫ থেকে ১৮ জন সুস্থ শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র ড্রপলেটের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, ভাইরাসটি বাতাসে বা কোনো বস্তুর ওপর প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে আক্রান্ত শিশুর ব্যবহৃত পোশাক বা খেলনা স্পর্শ করলেও অন্য শিশু দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে।

২. হাম কেন জটিল আকার ধারণ করে?

হামের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে প্রায় অকার্যকর করে দেয়। ফলে আক্রান্ত শিশু খুব সহজেই অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণে পড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে তিনটি প্রধান জটিলতা চিহ্নিত করছেন:

  • নিউমোনিয়া: হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো সেকেন্ডারি ইনফেকশন হিসেবে ফুসফুসে নিউমোনিয়া হওয়া।

  • এনসেফালাইটিস: এটি সরাসরি মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটায়, যা থেকে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা খিঁচুনি হতে পারে।

  • অন্ধত্ব ও ডায়রিয়া: হামের ফলে শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়, যা শিশুকে স্থায়ীভাবে অন্ধ করে দিতে পারে। এছাড়া তীব্র পানিশূন্যতা ও কুষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

৩. নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের উচ্চ ঝুঁকি

জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী হামের প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। কিন্তু বর্তমানে এর চেয়ে কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ দায়ী:

  • অপুষ্টি: অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

  • বুকের দুধের অভাব: ৬ মাস পর্যন্ত কেবল মায়ের বুকের দুধ এবং ২ বছর পর্যন্ত তা চালিয়ে না যাওয়া শিশুর সুরক্ষাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

  • আশেপাশে সংক্রমণের আধিক্য: এলাকায় প্রাদুর্ভাব বেশি থাকলে টিকা নেওয়ার আগেই শিশু ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে।

৪. টিকাদানে ঘাটতি ও সচেতনতার অভাব

গত বছর টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। টিকা সরবরাহ এবং কভারেজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে ডোজ পায়নি। এর পাশাপাশি অনেক অভিভাবকের অবহেলা ও টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার কারণে শিশুরা অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, টিকা নেওয়া মানেই যে সংক্রমণ হবে না তা নয়, তবে টিকা দেওয়া থাকলে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

৫. লক্ষণ ও করণীয়: অভিভাবকদের করণীয়

ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৭ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পায়। শুরুতে উচ্চ জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ে। এরপর মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লাল র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে।

চিকিৎসা ও সুরক্ষা:

  • লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা: হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল এবং প্রচুর তরল খাবার নিশ্চিত করতে হবে।

  • ভিটামিন ‘এ’: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি।

  • আলাদা রাখা (Isolation): ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এই সময় শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে।

  • দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ: শ্বাসকষ্ট বা তীব্র ডায়রিয়া দেখা দিলে মুহূর্ত দেরি না করে শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে।

হামের এই ক্রমবর্ধমান সংক্রমণকে একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা এবং প্রতিটি শিশুকে সময়মতো দুই ডোজ টিকা (৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে) নিশ্চিত করাই এখন একমাত্র সমাধানের পথ। অভিভাবকদের সচেতনতা আর সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই পারে হাজার হাজার শিশুর জীবন বাঁচাতে।


এ জাতীয় আরো খবর...