মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কতটুকু অবশিষ্ট: গোয়েন্দা তথ্যের গোলকধাঁধায় ইসরায়েল

বিশেষ প্রতিবেদক | জেরুজালেম-তেহরান ডেস্ক / ১৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) অভ্যন্তরে এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আজ ৩৭তম দিনে এসে তেল আবিবের সামরিক নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তেহরানের হাতে আসলে আর কতটি ‘তুরুপের তাস’ বা ক্ষেপণাস্ত্র বাকি আছে? যদিও যুদ্ধের শুরু থেকেই আইডিএফ দাবি করে আসছে যে তারা ইরানের সক্ষমতাকে প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য এবং সাম্প্রতিক কিছু সামরিক পরিসংখ্যান সেই দাবিকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যে বিভাজন: কয়েকশ বনাম এক হাজার

শনিবার রাতে ইসরায়েলি গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন সারা বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে আইডিএফ বিমান বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা কর্নেল ‘টি’ (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম গোপন রাখা হয়েছে) এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তার মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে এখনও ১,০০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম।

এই তথ্যটি আইডিএফ-এর গত কয়েক সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর আগে আইডিএফ-এর অধিকাংশ কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন যে, ইরানের কাছে বর্তমানে মাত্র ‘কয়েকশ’ ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে। জেরুজালেম পোস্ট এবং আইডিএফ-এর মধ্যে এই বিষয়ে আলোচনার সময় সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে যে, প্রকৃতপক্ষে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের সঠিক অবস্থা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কেউ ১০০ শতাংশ নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারছে না। এই অনিশ্চয়তা ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিশাল কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে ‘জীবন্ত’ ক্ষেপণাস্ত্রের রহস্য

ইসরায়েলি হামলার পর কতটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে—তা নির্ধারণ করা এখন গোয়েন্দাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনিশ্চয়তার পেছনে প্রধান কারণ হলো ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’ বা সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা। ইসরায়েলি বিমান হামলায় অনেক সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ বা ঘাঁটি ধসে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর অবস্থা কী?

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের ধরন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে সামান্য ধস নেমেছে যা ইরান খুব দ্রুত সরিয়ে ফেলতে সক্ষম। আবার কিছু ক্ষেত্রে বড় ধরণের ধস ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে পুরোপুরি চাপা দিয়েছে। কিন্তু ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর হাতে আসা বিদেশি গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরান অত্যন্ত বিস্ময়কর সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা একদিনেরও কম সময়ের মধ্যে ধসে পড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা সাইলো (Silo) পুনরুদ্ধার করে পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের উপযোগী করে তুলছে। এর মানে হলো, ইসরায়েল যাকে ‘স্থায়ী ধ্বংস’ বলে ধরে নিয়েছে, ইরান তাকে ‘সাময়িক বিঘ্ন’ হিসেবে মোকাবিলা করছে।

ক্ষেপণাস্ত্র বনাম উৎক্ষেপক যন্ত্র (Launcher)

যুদ্ধে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই হয় না, তা ছোড়ার জন্য উৎক্ষেপক যন্ত্র বা লঞ্চার অপরিহার্য। আইডিএফ বিভিন্ন সময়ে ইরানের উৎক্ষেপক যন্ত্র ধ্বংসের ভিন্ন ভিন্ন হিসাব দিয়েছে। বর্তমানে সামরিক বিশ্লেষকদের গড় হিসাব হলো:

  • ইরানের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক বর্তমানে অকার্যকর।

  • এর মধ্যে ৫০ শতাংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

  • বাকি ৫০ শতাংশ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে যা মেরামত বা পুনরুদ্ধারের অপেক্ষায়।

ইসরায়েলের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, যদি ইরান এই চাপা পড়া উৎক্ষেপকগুলো দ্রুত উদ্ধার করে ফেলতে পারে, তবে তাদের আক্রমণ করার সক্ষমতা রাতারাতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে ইরানকে ‘নিষ্ক্রিয়’ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা এক বিশাল আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠতে পারে।

অঙ্কের হিসাবে অমিল ও আইডিএফ-এর সংশয়

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা নিয়ে আইডিএফ-এর দেওয়া তথ্যের মধ্যে গাণিতিক কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। বিষয়টি সহজভাবে বিশ্লেষণ করলে এমন দাঁড়ায়:

  • প্রাথমিক ভাণ্ডার: যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল প্রায় ২,৫০০টি (আইডিএফ-এর তথ্য অনুযায়ী)।

  • মোট উৎক্ষেপণ: ইরান এ পর্যন্ত সরাসরি ইসরায়েলে ছুঁড়েছে ৫০০টির বেশি এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর দিকে সম্মিলিতভাবে ছুঁড়েছে প্রায় ১,৩০০টি ক্ষেপণাস্ত্র।

  • মোট ব্যয়: অর্থাৎ ইরান ইতিমধ্যে কমপক্ষে ১,৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে।

এখন সাধারণ বিয়োগফল অনুযায়ী (২৫০০ – ১৮০০), ইরানের হাতে থাকার কথা সর্বোচ্চ ৭০০টি ক্ষেপণাস্ত্র। এর মধ্যে যদি আইডিএফ-এর দাবি অনুযায়ী তারা আরও কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে থাকে, তবে সংখ্যাটি ৩০০-৪০০ এর নিচে নেমে আসার কথা। কিন্তু কর্নেল ‘টি’-এর দেওয়া ১,০০০-এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্রের তথ্যটি যদি সত্যি হয়, তবে তার মানে দাঁড়ায়—যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা আইডিএফ অনেক কম অনুমান করেছিল। ২০২৫ সালের জুনেও আইডিএফ তাদের গোয়েন্দা তথ্য সংশোধন করে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ এ উন্নীত করেছিল। এই বারবার তথ্য পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, ইরানের প্রকৃত সামরিক শক্তি সম্পর্কে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যে বড় ধরণের ঘাটতি রয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার হার ও বর্তমান পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্র এবং আইডিএফ দাবি করেছে যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে তারা দেখিয়েছে যে, যুদ্ধের চতুর্থ দিনের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার হার প্রতিদিন ২০টির নিচে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটি আরও কমে গেছে।

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার হার কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের অস্ত্র ফুরিয়ে গেছে। এটি ইরানের একটি ‘কৌশলগত নীরবতা’ও হতে পারে। তেহরান হয়তো তাদের অবশিষ্ট শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোনো একটি বড় ধরণের পাল্টা আক্রমণের জন্য জমিয়ে রাখছে। বিশেষ করে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সমন্বয় নিয়ে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হবে, তখন ইরান এই ‘গোপন ভাণ্ডার’ ব্যবহার করে বড় ধরণের ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা করতে পারে।

এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের প্রচেষ্টা এখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কখনও স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে হিসাব দিচ্ছে, আবার কখনও বিদেশি সূত্রের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু ইরানের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ব্যবস্থার জটিলতা ও তাদের দ্রুত পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা সব হিসাবকে বারবার ভুল প্রমাণিত করছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল সংখ্যার নয়, বরং ‘টাইমিং’-এর। ইরানের হাতে ১,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র থাকুক বা ৫০০—তার একটি অংশও যদি ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Iron Dome বা Arrow) ফাঁকি দিয়ে আঘাত হানতে পারে, তবে তা যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেবে। আর সেই অনিশ্চয়তার কুয়াশা নিয়েই এখন দিন কাটাচ্ছেন আইডিএফ-এর শীর্ষ কমান্ডাররা।

📈 গোয়েন্দা তথ্যের গাণিতিক সমীকরণ

📍 যুদ্ধের শুরুতে মোট সংখ্যা (আনুমানিক):
২,৫০০ – ৩,০০০টি
🚀 এ পর্যন্ত মোট উৎক্ষেপণ:
১,৮০০+টি
🛡️ আইডিএফ-এর আশাবাদী অনুমান:
কয়েকশ মাত্র
⚠️ কর্নেল টি-এর সতর্কবার্তা:
১,০০০-এর বেশি

“তথ্য অস্পষ্ট হওয়ার মানে হলো—বিপদ এখনও শেষ হয়ে যায়নি।”


এ জাতীয় আরো খবর...