মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

নিরস্ত্রীকরণের দাবি অগ্রহণযোগ্য: গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া অস্ত্র ছাড়বে না হামাস

গাজা-কায়রো ডেস্ক / ১২ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলে যখন ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ বা অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি কোনোভাবেই আলোচনা করা সম্ভব নয়— সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংগঠনটির সশস্ত্র শাখা ইজ্জাদিন আল-কাসাম ব্রিগেডস।

আবু উবাইদার কড়া হুঁশিয়ারি

রোববার একটি টেলিভিশন বিবৃতিতে আল-কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু উবাইদা সরাসরি জানিয়ে দেন, “আমরা অস্ত্র ছাড়ব না।” তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, হামাসকে নিরস্ত্র করার এই দাবি আসলে ইসরায়েলের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের নিরস্ত্র করে ইসরায়েল গাজায় নির্বিঘ্নে তাদের ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যেতে চায়।

আবু উবাইদা বলেন, “এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে ইসরায়েলকে গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। যতক্ষণ না দখলদার বাহিনী তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত অস্ত্রের বিষয়ে কোনো আলোচনা করা অমার্জিত এবং এটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।”

ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও নিরস্ত্রীকরণ বিতর্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফার গাজা পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করা। কায়রোতে মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে এই বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। তবে হামাসের দাবি—যুদ্ধবিরতির সব শর্ত বাস্তবায়ন এবং গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের স্পষ্ট রূপরেখা না থাকলে এই আলোচনা সামনে এগুবে না।

অন্যদিকে, ইসরায়েল সরকার তাদের অবস্থানে অনড়। তাদের দাবি, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে যাবে না। এই পারস্পরিক বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা এখন এক বড় ধরণের অচলাবস্থার মুখে পড়েছে।

তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ও মানবিক বিপর্যয়

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় একটি আনুষ্ঠানিক ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। হামাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির সময়কালেই ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ৭০৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

সামগ্রিক যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরতে গিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত গাজায় ৭২,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ১,৭২,০০০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ মনে করছে, এই ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে গাজা পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন হবে।

আঞ্চলিক উত্তাপ ও লেবানন পরিস্থিতি

বিবৃতিতে আবু উবাইদা কেবল গাজা নয়, বরং আঞ্চলিক সংঘাত নিয়েও কথা বলেন। তিনি লেবাননে ইসরায়েলের নতুন হামলার তীব্র নিন্দা জানান। গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ছোড়ার পর থেকে লেবানন সীমান্তে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তাতে এ পর্যন্ত ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

আবু উবাইদা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইরান, হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাদের বীরত্বের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ফিলিস্তিনিদের জন্য পাস হওয়া নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনের কঠোর সমালোচনা করে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি কারাগারে বন্দীদের মুক্ত করার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

রোববারের তাজা হামলা ও হতাহত

শান্তি আলোচনার সমান্তরালে গাজায় রক্তক্ষরণ থামছে না। রোববার গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শেজাইয়া পাড়া এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে আরও এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি বাহিনী উপত্যকার একাধিক এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৯৬৮ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি এখনও বহুদূর।

শান্তির পথে কাঁটা

হামাসের এই অনড় অবস্থান এবং ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণের জেদ গাজায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে। আবু উবাইদা মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার আগে ইসরায়েলকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে চাপ দেয়। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘বোর্ড অব পিস’ বা ট্রাম্পের পরিকল্পনা কেবল নথিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

📉 গাজা সংকট: এক নজরে মানবিক বিপর্যয়

মোট নিহত (অক্টোবর ‘২৩ থেকে)

৭২,০০০+ জন

মোট আহত (অক্টোবর ‘২৩ থেকে)

১,৭২,০০০+ জন

নিহত (অক্টোবর ‘২৫ যুদ্ধবিরতির পর)

৭১৬ জন

পুনর্গঠন ব্যয় (জাতিসংঘের প্রাক্কলন)

৭০ বিলিয়ন ডলার

অবকাঠামো ধ্বংসের হার

৯০% (পুরো গাজা)

“সেনা প্রত্যাহার ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয়।” — আবু উবাইদা


এ জাতীয় আরো খবর...